← সব গল্পে ফিরে যান
বিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার গল্প / পর্ব 01

স্কুল সংস্কার

সম্পূর্ণ সত্য ঘটনার অবলম্বনে

সম্পূর্ণ লিখিত গল্প

সালটা ১৮২৪, রাত ৮টা ১৫। কিছুদিন আগেই দেশে স্বৈরশাসনের পতন হয়েছে। চারদিকে সংস্কারের হাওয়া। স্কুলের মূল ফটকের সামনে ছোট ভাইদের নিয়ে আড্ডায় মগ্ন ১৮২০ ব্যাচের তানিম। তখনকার ছেলেদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। লিডার বললেও খুব একটা ভুল হবে না। হঠাৎ ১৮২১ ও ১৮২২ ব্যাচের চার তরুণ স্যাম, দেওয়ান হামজা, রাশেদ শেখ ও তাহমিদ তার সঙ্গে দেখা করতে এলো। ছেলেগুলো নম্র, ভদ্র, বুদ্ধিমান। অভাব শুধু নেতৃত্বের। তাদের হাতে স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান নিয়ে তৈরি ১৩ দফার একটি খসড়া। তৎকালীন প্রিন্সিপাল শামসে আরা, স্বৈরশাসনের আমলের রেখে যাওয়া এক শক্ত বীজ। সবাই তাকে মোটামুটি বাঘের মতো ভয় পেত। সব শুনে তানিম বলল, “স্কুলটা তো আমাদের একার না। সব ব্যাচের এক-দুইজন ভাইকে দেখাই, মতামত নিই।” কথাটা তখন বেশ ভালোই মনে হয়েছিল। ⸻ ঘটনা, দিন ২ ১৩ দফা নিয়ে শুরু হলো বিভিন্ন ব্যাচের ‘গণ্যমান্য’ ব্যক্তিদের কাছে যাত্রা। তখন অবশ্য তারা সত্যিই তাঁদের গণ্যমান্য ভাবত। এখানেই আবির্ভাব ১৮০১ ব্যাচের আনভীর রহমান চন্দন। চন্দন ভাই তালিকা হাতে নিয়েই ভালো করে পড়ার আগেই বিভিন্ন আদু ভাইকে ফোন দেওয়া শুরু করলেন। তরুণেরা অবাক! তারা এসেছিল একজনের মতামত নিতে, অথচ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে স্কুল সংস্কার নয়, পুরো গ্রামের বনভোজনের আয়োজন চলছে। এই গতিতে চললে ১৩ দফা স্কুলে পৌঁছাতে কম করে হলেও একশ বছর লাগবে। তবুও সম্মান রেখে চন্দন ভাইয়ের পরামর্শে তারা দেখা করল তাঁর দুই ভাই-কাম-বডিগার্ড ভাইপার ও বিক্রিয়া ছাড়খারের সঙ্গে। তাঁরাও ব্যস্ত ভঙ্গিতে আরও তিন-চারজন আদু ভাইয়ের নাম ধরিয়ে দিলেন। এবার চার তরুণ বুঝে গেল। এভাবে ঘুরতে থাকলে স্কুলের সংস্কার হবে কি না জানা নেই, তবে তাদের নিজেদেরই একদিন সিনিয়র আদু ভাই হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তারা ঠিক করল, বড় ভাইদের পেছনে আর ঘোরা হবে না। তেরো দফা এবার সরাসরি পাবলিকের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। পাবলিক কী করবে, সেটা অবশ্য কেউ জানে না। ⸻ বাসায় ফেরার সময় তানিমের হঠাৎ দেখা হলো ১৮১১-এর ফাহাদ কারজাইয়ের সঙ্গে। নাম শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মানুষটি ভালো। তবে বুদ্ধিমান মানুষদের একটা সমস্যা আছে। তারা কাগজ হাতে পেলেই ভুল ধরতে শুরু করে। ফাহাদ ভাই তেরো দফা কিছুক্ষণ দেখে বললেন, “কাল বাসায় আয়।” পরদিন তানিম চারজনকে নিয়ে হাজির হলো। আলোচনা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল, তেরো দফার সব দফা পৃথিবীতে থাকার মতো যোগ্য না। কয়েকটা অযৌক্তিক, কয়েকটা অপ্রাসঙ্গিক। শেষ পর্যন্ত তিনটা দফাকে পৃথিবী থেকে বিদায় দেওয়া হলো। তেরো দফা হয়ে গেল দশ দফা। ফাহাদ কারজাইয়ের বাসা অজান্তেই স্কুল সংস্কারের সদর দপ্তর হয়ে গেল। ⸻ ১০ দফার মিটিং চলাকালেই স্কুলের এক শিক্ষকের ভয়াবহ কেলেঙ্কারি বের হয়ে এলো। এমনিতেই সবার মাথা গরম, এই ঘটনায় তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। বিষয়টাও ১০ দফায় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে জায়গা পেল। এদিকে সরকার পতনের পর শহরের জায়গায় জায়গায় মবের ছড়াছড়ি। কিন্তু ছেলেগুলো শুরু থেকেই মবের বিরুদ্ধে। তাদের কথা পরিষ্কার: স্কুল ভাঙতে দুই মিনিট, ঠিক করতে সময় লাগে। তাই তারা শিক্ষকদের বাসায় বাসায় ঘুরে বোঝার চেষ্টা শুরু করল, স্কুলটা দিন দিন নিচের দিকে যাচ্ছে কেন এবং এই প্রিন্সিপালকে রেখেই সংস্কার সম্ভব কি না। দলটাও ছিল বিচিত্র। স্যাম শান্ত, কিন্তু মাথা ঠান্ডা রেখে বেশ দূর পর্যন্ত ভাবতে পারে। তাহমিদ কথার ওস্তাদ। তার সঙ্গে তর্কে নামলে নিজের কথাই একসময় ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। রাশেদ শেখ লেখালেখির লোক। দেওয়ান হামজা সবার ছোট, কিন্তু মাঠের কাজে একাই এগারো। আর তানিম? মেজাজ গরম, তবে লিডারশিপ ভালো। উপর-নিচ মিলিয়ে সবার সঙ্গেই তার কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে। কিছু ভালো, কিছু আবার না থাকলেই ভালো হতো। সত্যি বলতে, ছেলেগুলো মন্দ ছিল না। সমস্যা একটাই। তারা তখনও জানত না, স্কুল সংস্কার করতে গিয়ে সামনে তাদের জন্য কী পরিমাণ বিনোদন অপেক্ষা করছে। ⸻ যাই হোক, সংস্কারের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে করতে একদিন তারা হাজির হলো এক শিক্ষকের বাসায়। শিক্ষকের নাম? থাক। বেচারা মুখ ফসকে এমন এক দুর্নীতির আভাস দিয়ে দিলেন যে এখানে আবার তার নাম বলে আরেক বিপদ ডেকে আনার দরকার নেই! ছেলেপেলে যেন আকাশ থেকে পড়ল। এতদিন তারা ছিল অবকাঠামো উন্নয়নের চিন্তায়। এখন দেখা যাচ্ছে ঘুরতে ঘুরতে দুদকের কাজও করতে হবে! এ তো মহা মুসিবত! কিন্তু এক জায়গায় যখন হাত দিয়েছেই, শেষ না দেখে ছাড়বে কেন? ব্যস, শুরু হয়ে গেল প্রিন্সিপালের কথিত দুর্নীতির রহস্য উদ্ঘাটনে তাদের শখের গোয়েন্দাগিরি। স্কুল সংস্কার করতে এসে তারা যে একদিন গোয়েন্দা হয়ে যাবে, এটা সম্ভবত ১০ দফার খসড়াতেও লেখা ছিল না! একদিকে আমাদের শ্রদ্ধেয় বড় ভাইরা সবাই একসঙ্গে বৈঠকে বসতে প্রস্তুত, অন্যদিকে সেই ছেলেপেলেরা মাঠের মধ্যে উঠেপড়ে লেগেছে প্রিন্সিপালের কেলেঙ্কারি বের করতে। গোয়েন্দাগিরি করা কোনো সহজ বিষয় ছিল না। টাকা-পয়সার হিসাব, বিগত ১০ বছরের কেলেঙ্কারি, কে কখন কী করেছে, কোথায় কত টাকা গেছে, সবকিছুর প্রমাণ রাখা জরুরি। যে ভাবা, সেই কাজ। তারা লেগে পড়ল। সব কেলেঙ্কারি বের করতে এই ছেলেপেলেদের উৎসাহ দিতে কলকাতা থেকে এসে যুক্ত হলো কমলা বাবু। তিনিও সেই স্কুলের একজন প্রাক্তন ছাত্র। তবে তার গুরুত্ব এখানে অনেক, কারণ তিনি ছিলেন ফাহাদের মতোই এক তুখোড় চিন্তাধারার মানুষ। যাই হোক, দলে যুক্ত হলো সব মিলিয়ে সাতজন। হেডকোয়ার্টার: আফগানিস্তানের পাস্তুনি ফাহাদ কারজাইয়ের বাসা। ⸻ তদন্ত শুরু তদন্তের প্রথম ধাপেই পাঁচ তরুণ হাজির হলো স্কুল কমিটির প্রাক্তন সদস্য কালাম সাহেবের বাসায়। তাহমিদ, রাশেদ আর স্যাম একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে যাচ্ছে। স্কুলের উন্নতি হচ্ছে না কেন? এত টাকা যায় কোথায়? ফান্ড আসে, কিন্তু কাজ দেখা যায় না কেন? অন্যদিকে দেওয়ান হামজা চুপচাপ বসে সব কথা গোপনে রেকর্ড করছে। কালাম সাহেব হয়তো ভাবলেন, অন্তত এই ছেলেটা ভদ্র। তিনি জানতেন না, আসল বিপদ ওই দিকেই বসে আছে! কথা যত এগোয়, বেরিয়ে আসে এক বিশাল টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগ। একটা তথ্য নোট করতে না করতেই আবার ফোন। শহরের এক প্রভাবশালী নেতা জানতে চাইলেন তারা কী নিয়ে তদন্ত করছে। সঙ্গে সাহায্যের আশ্বাসও দিলেন। ছেলেরা বুঝল, এই শহরে খবরের গতি ইন্টারনেটের থেকেও ভালো! কালাম সাহেবের বাসা থেকে বেরিয়েই তারা ছুটল নেতা মশরুর সিদ্দিকের কাছে। পাশাপাশি আরও দুই-তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে টেন্ডারের ঘটনা যাচাই করল। এক জায়গার কথা আরেক জায়গায় মিলছে। অর্থাৎ ঘটনা শুধু আছে না, বেশ স্বাস্থ্যবান অবস্থাতেই আছে। সেখানেই বের হলো আরেক কাহিনি। নতুন বিল্ডিং করার সময় স্কুলের কয়েক লাখ টাকা নাকি এমনভাবে উধাও হয়েছে, যেন টাকাগুলোর স্কুলে পড়াশোনা করতে ভালো লাগেনি। সঙ্গে উঠে এলো দীপেন চক্রবর্তীর নাম। প্রিন্সিপালের রাইট হ্যান্ড বললে খারাপ হবে না। উন্নয়নের নামে বারবার ফান্ড এসেছে, অথচ ক্যান্টিন আগের মতো, লাইব্রেরিতে নতুন বই নেই, খাবারেরও উন্নতি নেই। উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু ঠিক কোথায় হয়েছে, সেটাই ছিল গবেষণার বিষয়। ⸻ এরপর তারা গেল এক প্রাক্তন শিক্ষকের কাছে। শিক্ষক প্রথমে ভয়ে কিছুই বললেন না। ছেলেরা ফিরে এলো। পরে সেই শিক্ষক নিজেই যোগাযোগ করে স্কুল নির্মাণ থেকে শিক্ষক নিয়োগ, এমন সব সমস্যার কথা বললেন যে খাতায় নতুন পৃষ্ঠা খুলতে হলো। এভাবে তারা কাউকেই বাদ দিল না। শিক্ষক, সদস্য, পাহারাদার, অভিভাবক, একেকটা অভিযোগ সত্য কি না নিশ্চিত হতে সাত-আটজনের সঙ্গে কথা বলেছে। প্রতিদিন দশ-বারো ঘণ্টা সময় গেছে এর পেছনে। পাহারাদারের কাছ থেকে বের হলো ক্যান্টিন ব্যবসা আর প্রিন্সিপালের ড্রাইভারের প্রভাবের গল্প। অভিভাবকদের কাছ থেকে এলো হেনস্তার অভিযোগ। আর ভর্তি বাণিজ্যের খবর দিলেন এমন একজন, যিনি আবার প্রিন্সিপালের খুব কাছের লোক! শুনতে সহজ লাগলেও কথা বের করা মোটেও সহজ ছিল না। প্রিন্সিপাল তখনও স্কুলে বহাল তবিয়তে। কার মুখের কথা তার কানে যায়, পরদিন কার চাকরি থাকে, এর কোনো গ্যারান্টি ছিল না। তাই তদন্তের চেয়ে মানুষকে কথা বলানোতেই বেশি গোয়েন্দাগিরি করতে হয়েছে। ⸻ শেষে পাঁচ তরুণ, কমলা বাবু আর ফাহাদ কারজাই সব অভিযোগ নিয়ে বসল হেডকোয়ার্টারে, অর্থাৎ ফাহাদের বাসায়। ঠিক তখন আনভীর রহমান চন্দনের ফোন। “কিং জং উংসহ সবাই আজকেই বসি। কী করা যায় ফাইনাল করি।” বলে রাখা ভালো, কিং জং উং ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবী! এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী! তরুণদের মনে আশার আলো। এতদিনের তদন্ত এবার বুঝি কাজে লাগবে! সবাই হাজির হলো এক হোটেলে। তবে জায়গাটা দেখে প্রথমেই মনে হলো, ফাহাদের বাসাই এর চেয়ে দশ গুণ ভালো হেডকোয়ার্টার ছিল। গরিবি পরিবেশে কিছু গরিব এবং কিছু অত্যন্ত তুখোড় মস্তিষ্ক একত্র হলো। সভা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু আয়োজক কিং জং উং সাহেবই নাই! সমাজসেবী মানুষ। হয়তো আসার পথে সমাজ উদ্ধার করতে গিয়ে আটকে গিয়েছিলেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি হাজির হলেন। তারপর শুরু হলো আসল নাটক। এক পক্ষ বলল, “বেশি আগানো ঠিক হবে না, উনি অনেক বড় মাপের মানুষ।” এই পক্ষের অন্যতম মুখ বিক্রিয়া ছাড়খার। অন্যদিকে তরুণদের কথা পরিষ্কার। এত কিছু যখন বের হয়েছে, ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সাবেক শাসকের মতো গাম্ভীর্য নিয়ে কিং জং উং সাহেব বললেন, “রাজনৈতিকভাবে আগাতে হবে। মিডিয়া লাগবে। প্রেস ব্রিফিং করতে হবে।” পাঁচ তরুণ একে অন্যের দিকে তাকাল। তারা দশ-বারো ঘণ্টা করে তদন্ত করেছে, মানুষ ধরে ধরে তথ্য মিলিয়েছে, রেকর্ড করেছে। আর শেষ সমাধান হলো প্রেস ব্রিফিং! তাদের ভাষায়, পিউর বুলশিট। সবচেয়ে মজার বিষয়, যাদের পরিশ্রমে এত কিছু বের হলো, সেই তরুণদের কথাই সভায় খুব একটা শোনা হলো না। তারা সাহায্য নিতে এসেছিল, উল্টো তারাই প্রশ্নের মুখে পড়ল। বড় ভাইয়েরা সাহস দেওয়ার বদলে এমন সাবধানে আগাচ্ছেন, যেন সামনে প্রিন্সিপাল না, ল্যান্ডমাইন বসানো আছে। শেষমেশ কিং জং উং তার পরিচিত সাংবাদিককে ফোন দিলেন। সবাই ভাবল, এইবার কিছু একটা হবে। কিন্তু সাংবাদিক মহলও সম্ভবত তখন সমাজসেবায় ব্যস্ত ছিল। ফোন খুব একটা পাত্তা পেল না। ব্যস! সংস্কার অভিযান গেল হাফটাইমে। তরুণরা হতাশ হয়ে সেই গরিবি জলসা থেকে বাসায় ফিরল। এতদিন তারা ভাবছিল সমস্যা একটাই, প্রিন্সিপাল। সেদিন বুঝল, প্রিন্সিপালকে নামানোর আগে বড় ভাইদের মিটিং শেষ করাটাই সম্ভবত বড় চ্যালেঞ্জ!