(গল্পটা শেষ অব্দি পড়ার অনুরোধ রইল। গল্পের নায়ক লুকিয়ে আছে এই এপিসোডে!) দিনটি শুক্রবার। গরমটা একটু বেশি, তবে স্কুলের পরিস্থিতি তার চেয়েও গরম। শামসে আরার বিরুদ্ধে ততদিনে এমন সব প্রমাণ জোগাড় হয়েছে যে, কাগজগুলো একসাথে করলে ছোটখাটো একটা বালিশ বানানো যায়। সমস্যা একটাই—প্রমাণ সবার হাতে আছে, সাহস কারও হাতে নেই! সবাই মনে মনে একমত—এই প্রিন্সিপালকে রেখে স্কুল সংস্কার করা আর ছাতা মাথায় দিয়ে গোসল করা প্রায় একই ব্যাপার। কিন্তু কথাটা মনে মনে বলাই নিরাপদ। কারণ শামসে আরা তখন যেন প্রিন্সিপাল কম, স্কুলের জমিদার বেশি! প্রাক্তন ছাত্রদের স্কুলে ঢুকতেই নোটিশ লাগে, আর ঢুকে তাঁর সামনে দাবি রেখে তাঁকেই নামানোর কথা বলা—এটা তখন তরুণদের কাছে শিক্ষা সংস্কারের চেয়ে আত্মহত্যার নতুন পদ্ধতি বলেই মনে হচ্ছিল। তবু তরুণরা ঠিক করল—স্কুল সংস্কার করতেই হবে। সাত গোয়েন্দা আবার প্ল্যানে বসল। সিদ্ধান্ত হলো—আগে কেলেঙ্কারিগুলো পত্রিকায় যাবে, তারপর প্রেস ব্রিফিং, সবশেষে ভদ্রভাবে স্কুলে গিয়ে দাবি জানানো হবে। পরিকল্পনা শুনে মনে হলো, এবার শামসে আরার দিন শেষ! লেখা আছে, প্রমাণ আছে—শুধু পত্রিকায় ছাপা বাকি। দুই দল বের হলো। একদল গেল আশার আলো পত্রিকায়, আরেকদল প্রকৃতির ডাক-এ। কিন্তু যা বাবা! পত্রিকার লোকজনও কেলেঙ্কারি ছাপাতে নারাজ। কারণ একটাই—ভয়! এখন বুঝেন, মহিলার ক্ষমতা কতদূর! হতাশ হয়ে সবাই হেডকোয়ার্টারে ফিরল। রবিবার রাতে আবার বৈঠক। চারদিকে তখন মবের ছড়াছড়ি। চাইলেই লোকজন নিয়ে গেট ভেঙে শামসে আরাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু ছেলেগুলো শুরু থেকেই এই রাস্তার বিপক্ষে। তাছাড়া এমন কিছু টের পেলে শামসে আরা স্কুলেই আসবেন না—তখন আন্দোলন হবে কার বিরুদ্ধে? রাতে চন্দন সাহেবকে ফোন দেওয়া হলো। তিনি হেডকোয়ার্টারের নিচে এসে চায়ের কাপ হাতে বৈঠকে বসলেন। তানিমের অবশ্য ততক্ষণে মাথার তার গরম। এতদিন গোয়েন্দাগিরি, কাগজপত্র, দৌড়াদৌড়ি করে তার ধৈর্যের মেয়াদ শেষ। সে চায়ের কাপ রেখে বলল, —“ধুর ভাই! এত প্ল্যান করে লাভ নাই। কাল সকালেই স্কুলে যাবো। খেল খতম!” সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রস্তাবটা সহজ, কিন্তু সহজ জিনিসই মাঝে মাঝে সবচেয়ে ভয়ংকর। চন্দন ভাই বললেন, —“এইভাবে গেলে হবে না। একবার সুযোগ হাতছাড়া হলে এরপর হয়তো স্কুলে ঢুকতেই দিবে না।” কমলা বাবু এতক্ষণ চুপ ছিলেন। এবার খুব শান্তভাবে বললেন, —“ভাই, আপনি তো এখনো স্কুলে ঢুকতে পারতেছেন না…” চন্দন ভাই চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া বন্ধ করলেন। ঘরে আবার নীরবতা। মনে হলো—নতুন কোনো প্ল্যান মাথায় ঢুকেছে! চন্দন বাবু অনেকক্ষণ চিন্তা করে নতুন প্ল্যান দিলেন। —“এক কাজ করি, সব বড় ভাইদের খবর দেই। সবাই কবে ফ্রি আছে দেখি। তারপর সবাই একসাথে স্কুলে গিয়ে প্রস্তাব রাখবো।” চন্দন বাবু সঙ্গে সঙ্গে দুই-একজনকে ফোনও দিলেন। প্রথমজন ব্যস্ত। দ্বিতীয়জন আরও ব্যস্ত। তৃতীয়জনের এমন ব্যস্ততা, মনে হলো দেশের অর্থনীতি একাই চালাচ্ছেন। মোটামুটি কোনো বাপের বেটারই এইসব নিয়ে সময় নাই! ছেলেপেলেরা চুপচাপ বসে চন্দন বাবুর ফোনালাপ শুনছে। একপর্যায়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। সবার মাথায় একই প্রশ্ন— “আমরা আন্দোলন করতে যাচ্ছি, নাকি বিয়ের দাওয়াত দিতে যাচ্ছি?” এইভাবে সবার ফ্রি টাইম মিলাতে গেলে শামসে আরা ম্যাডামকে নামানোর আগেই উনি চাকরির মেয়াদ শেষ করে অবসরে চলে যাবেন! অনেকক্ষণ চিন্তাভাবনার পর ফাহাদ বলল, —“আমরা যদি পাবলিকলি শামসে আরাকে নামানোর প্রস্তাব নিয়ে যাই, প্রথমত গেট দিয়েই ঢুকতে পারবো না। দ্বিতীয়ত, ঢুকলেও কীভাবে বের হবো সেইটা আল্লাহ জানে!” ওদিক থেকে বুদ্ধিমান স্যাম আরেক সমস্যা ধরল। —“আর শুধু আমরা প্রাক্তনরা গেলে হবে? বর্তমান ছাত্ররা না থাকলে আন্দোলনের যুক্তি কী?” ঘরে আবার নীরবতা। সমস্যা একটা না। সবচেয়ে বড় সমস্যা—এক রাতের মধ্যে এত মানুষ পাওয়া যাবে কোথায়? হঠাৎ তাহমিদ বলল, —“ভাই, আমরা তো ১ দফা নিয়ে যাবো না। আমরা পাবলিকলি ১০ দফা নিয়েই যাই! সবাই জানবে আমরা শুধু প্রস্তাব দিতে যাচ্ছি। কোনো বড় আন্দোলন না।” বুদ্ধি খারাপ না! ১০ দফা নিয়ে কথা বলতে গেলে শিক্ষকরা নিজেরাই গেট খুলে দেবেন। কে আর জানে, ১০ দফার পকেটের ভিতর ১ দফা চুপচাপ বসে আছে! এখন বাকি শুধু লোকজন। তানিম বলল, —“এইটা আমার উপর ছেড়ে দেন।” সে ফোন বের করল। প্রথমে ১৮২১-এর নিক্সন, ১৮২৩-এর রাফি, এরপর ১৮২৪-এর কয়েকজন বিশ্বস্ত ছেলেপেলে। বার্তা খুব সংক্ষিপ্ত— —“কালকে গদি নাড়াইতে যামু। ম্যাক্সিমাম পোলাপান নিয়ে স্কুলে আসিস। কিন্তু খবরদার! ১ দফার কথা কেউ জানবে না!” এরপর ফোন গেল স্কুলের বর্তমান ছাত্রদের এক লিডার ১৮২৫ ব্যাচের রাইয়ানের কাছে। —“ব্রাদার, কালকে ফোন নিয়ে স্কুলে যাবি। আর এমন অ্যাটেনডেন্স চাই, স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেরাই যেন অবাক হয়ে ভাবে—পোলাপানের হঠাৎ পড়ালেখার প্রতি এত আগ্রহ আসলো কই থেকে?” রাইয়ান বেশি প্রশ্ন করল না। শুধু বলল, —“ডান ভাই। কাজ হয়ে যাবে।” ফোন রাখা হলো। ঠিক তখনই বৈঠকের সবচেয়ে সিনিয়র মানুষ চন্দন বাবু আবার এক বালতি নেগেটিভ এনার্জি নিয়ে হাজির। —“কালকে তো আমার অফিস আছে! সব বড় ভাইদের ম্যানেজ করে মঙ্গলবার গেলে হয় না?” পোলাপান একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। এইদিকে বিপ্লব রেডি, ওইদিকে চন্দন ভাইয়ের অফিস! কিন্তু হঠাৎ খবর এলো—মঙ্গলবার থেকে আর জোরপূর্বক প্রিন্সিপাল নামানো যাবে না! সবাই চুপ। মনে হলো উপরওয়ালাও হয়তো বলছেন— “চন্দন, অফিস একদিন পরে করো। কালকেই যাও!” অতঃপর সেই সোনালি সকাল! পোলাপান স্কুলের সামনে জড়ো হতে শুরু করল। মিডিয়াও হাজির। মিডিয়ার সামনে অবশ্য গল্প একটাই— “আমরা ১০ দফা নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে এসেছি।” এতই শান্তিপূর্ণ যে কয়েকজনকে আগে থেকেই পিছনের গেটে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে—কেউ যেন “শান্তিপূর্ণভাবে” পালিয়ে যেতে না পারে! আর আমাদের চন্দন বাবু? তিনি আর বিক্রিয়া ছাড়খার সাহেব তখন স্কুলের পাশের গলিতে নিরাপদ দূরত্বে বসে বিপ্লব পর্যবেক্ষণ করছেন। —“পোলাপান তো অনেক কম!” —“তোমরা আসলেই পারবা?” —“আরেকটু লোক হইলে ভালো হতো না?” তরুণরা মনে মনে ভাবল— “এ কেমন সিনিয়র!” হঠাৎ সামনে থেকে শোনা গেল— “১০ দফা মানতে হবে!” পরিকল্পনামতো শিক্ষকরা সুন্দর করে মূল ফটক খুলে দিলেন। কোনো ঝামেলা নেই। কোনো বাধা নেই। মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম ধাপ সফল! তানিম সঙ্গে সঙ্গে রাইয়ানকে ফোন দিল— —“আমরা ঢুকতেছি। এখনই সবাইকে ক্লাস থেকে মাঠে নিয়ে আয়!” তারপর স্কুলের গেট পার হতেই ঘটল আসল ঘটনা। ১০ দফা সম্ভবত গেটের বাইরেই রেখে আসা হলো। তানিম চিৎকার দিল— “এক দফা! এক দাবি!” চারপাশ থেকে উত্তর— “শামসে আরার পদত্যাগ!” শিক্ষকরা সম্ভবত তখন বুঝলেন— ১০ দফার প্যাকেট খুলে ভেতর থেকে অন্য জিনিস বের হয়েছে! এর মধ্যেই রাইয়ান তার কাজ দেখিয়ে দিল। স্কুল ড্রেস পরা ছাত্রছাত্রীরা পাখির ঝাঁকের মতো মাঠে এসে হাজির। প্রাক্তন আর বর্তমান শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা! ফাহাদসহ আরও কয়েকজন সিনিয়রও যোগ দিলেন। স্কুলে তখন মানুষ আর মানুষ। দাবি একটাই— শামসে আরার পদত্যাগ! আর ঠিক তখনই… স্কুলের পাশের সেই চিপা গলি থেকে আবির্ভাব ঘটল দুই মহাপুরুষের। চন্দন বাবু ও বিক্রিয়া ছাড়খার! কিছুক্ষণ আগেও যারা বলছিলেন, “পোলাপান কম না?” “শরম দিতেরে!” “পারবা তো?” তাঁরাই এখন জনতার পাশে এসে এমন হুংকার দিলেন—মনে হলো পুরো আন্দোলনের পরিকল্পনা তাঁরা ১৭৭২ সাল থেকেই করে রেখেছেন! এমনকি সবাই একজন স্যারকে ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল নিয়োগ দিতে চাইলে চন্দন বাবু আরেকজনকে বানানোর জন্যে ঐ ভাইটাল মোমেন্টে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নষ্ট করলেন। তারপর স্কুলের সকল স্যার টিচারদের নিয়ে মিটিং হল, যার ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়, সেই মিটিংয়েও দুই আদু ভাই এমনভাবে বক্তৃতা দিলেন যেন উনারাই এই খেলার কারিগর। পোলাপান অবাক। গলিতে ছিলেন বিড়াল। আমরা স্কুল আর প্রিন্সিপাল রুম দখল করতেই উনারা বাঘে পরিণত হলেন। শেষ পর্যন্ত শামসে আরার পদত্যাগ হলো। চন্দন বাবু খুব হুংকার দিচ্ছিলেন তখন! কিন্তু ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর। এত মানুষ দৌড়াদৌড়ি করল, সাত গোয়েন্দা তদন্ত করল, রাইয়ান পুরো স্কুল মাঠে নামাল, তানিম গলা ফাটাল… কিন্তু গল্পের নায়ক এদের কেউ না। গল্পের আসল নায়ক— চন্দন ভাই! কারণ ইতিহাস শুধু মনে রাখবে বাঘের হুংকার। বাঘটা পাঁচ মিনিট আগেও কোন গলিতে বসে ছিল—সেটা ইতিহাস সাধারণত লিখে না! আর সেদিন থেকেই শুরু হলো— চন্দন বাবুর বাঘযুগ! 🐅
← সব গল্পে ফিরে যানবিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার গল্প / পর্ব 02
শামসে আরার পতন
সম্পূর্ণ সত্য ঘটনার অবলম্বনে
সম্পূর্ণ লিখিত গল্প