পুরোটা পড়ার অনুরোধ রইল, শেষে কিছু প্রশ্ন আছে—যেগুলোর উত্তর দিতে বাঘের অনুমতি লাগবে না! বাঘের বাঘযুগে এবার চরম বাধা এসে দাঁড়াল! এনার্কির দাবি ছিল খুবই সাধারণ। স্কুলের সকল প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটা সাধারণ সভার আয়োজন করতে হবে। দাবিটা শুনতে সহজ। কিন্তু আমাদের জলসা বাবাদের কাছে বিষয়টা ছিল প্রায় চাঁদে মানুষ পাঠানোর মতো জটিল। তাঁরা তখনো মুঘল আমলে বসবাস করছেন। পার্থক্য শুধু একটাই—মুঘলদের হাতে ছিল তলোয়ার, আর এঁদের হাতে চানাচুরের প্যাকেট। তাঁদের মতে, এত বড় সভা আয়োজন করা কোনো ছেলেখেলা নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ, দীর্ঘ সময় এবং সম্ভবত জাতিসংঘের বিশেষ অনুমতি। তবে তাঁদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। মানুষ তার চিন্তাভাবনার বাইরে যেতে পারে না। আমাদের জলসা বাবারা ছিলেন নিতান্তই আদু ভাই। তাঁদের জীবনে ভাপা পিঠা, চানাচুর আর জলসার আয়োজনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। অ্যালামনাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে পিঠার সঙ্গে নারকেল বেশি দেওয়া হলো কি না, সেই আলোচনা তাঁদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এমন মানুষদের কাছে সাধারণ সভার মতো বৈপ্লবিক চিন্তা আশা করা অন্যায়। অনেকটা রামছাগলের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাখ্যা চাওয়ার মতো। তবে চন্দন চতুরের ব্যাপারটা আলাদা। চন্দন বোকা মানুষ নয়। সে সম্ভবত বুঝে গিয়েছিল, সাধারণ সভা ডাকা মানেই বিপদ। এত দিন যে বাঘযুগের রাজত্ব সে আরাম-আয়েশে চালিয়ে এসেছে, সেখানে হঠাৎ সাধারণ মানুষের প্রবেশ ঘটলে বাঘের গর্জন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর বাঘের গর্জন বন্ধ হয়ে গেলে একটা ভয়ংকর সমস্যা দেখা দেয়। তখন সবাই বুঝে ফেলে, বাঘের চামড়ার নিচে আসলে কোন প্রাণীটা বসে আছে! চন্দন তাই আহ্বায়ক কমিটিতে থাকা তার হাতের পুতুলদের দিয়ে সাধারণ সভার দাবিকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। চন্দন চতুরের ভিলেজ পলিটিক্সের মস্তিষ্কে যে কূটবুদ্ধির বসবাস, তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। আগের পর্বেই বলেছিলাম, গ্রুপ বন্ধ করার পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল সেই বিখ্যাত শ্যাডো কমিটি। অর্থাৎ চন্দন, বিক্রিয়া, নান্টু ও তাঁদের সমমনা কিছু মহাপুরুষ। কমিটির অন্দরমহলে চন্দনের একছত্র নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ যখন এনার্কি সবার সামনে ফাঁস করে দেয়, তখন চাপে পড়ে গ্রুপটি আবার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হলো। চতুর চন্দন সে সময় এমন এক কাণ্ড ঘটাল, যা দেখলে মীরজাফরও সম্ভবত লজ্জায় মুখ ঢাকতেন। চন্দন অত্যন্ত নিষ্পাপ চেহারায়, কিউট অভিনয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এক বিশাল ধন্যবাদ বার্তা লিখে বসল— “ধন্যবাদ হাবলা ভাই, গ্রুপ উন্মুক্ত করে সবাইকে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।” আহা! কী সুন্দর কথা! কী উদার মন! এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। চন্দনের এই দ্বিচারিতা দেখে বোঝা গেল, মানুষ শুধু দুমুখো হয় না, প্রয়োজনে একই মুখ দিয়ে দুই বিপরীত চরিত্রে অভিনয়ও করতে পারে। আহারে চন্দন! তুমি আসলেই বাঘ। শুধু সমস্যা হলো, গর্জন করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে মিউ মিউ শব্দ বেরিয়ে যায়! যাই হোক, এনার্কি আর ইউথ উইং নিজেদের কাঁধে দায়িত্ব নিয়েই সভা আয়োজনের পরিকল্পনা করল। যেই ভাবা, সেই কাজ। এনার্কি ও ইউথ উইংয়ের সদস্যরা তাঁদের তুখোড় মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে লেগে পড়লেন একটি সফল সাধারণ সভা আয়োজনের কাজে। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা এতগুলো ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে একত্র করা, সবার মতামত নেওয়া, সবাইকে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া—এসব যে বিরাট কর্মযজ্ঞ! অন্তত আমাদের জলসা বাবাদের কাছে ব্যাপারটা ছিল প্রায় মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের সমতুল্য। তবে এনার্কির সদস্যরা আধুনিক যুগের মানুষ। তাঁরা প্রযুক্তি বোঝেন। মাল্টিমিডিয়া বোঝেন। পৃথিবী যে মুঘল আমল পার হয়ে অনেক দূর এগিয়েছে, সেই খবরও তাঁদের কাছে পৌঁছেছে। তাই আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সাহায্যে দেশ-বিদেশের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার ব্যবস্থা করা হলো। একটি বড় হলরুমে যথাযথভাবে আয়োজন করা হলো সাধারণ সভার। উপস্থিত হলেন বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। কেউ সশরীরে, কেউ ডিজিটাল মাধ্যমে। এ দৃশ্য দেখে জলসা বাবাদের কী অনুভূতি হয়েছিল, তা জানা যায়নি। তবে ধারণা করা যায়, তাঁদের কেউ কেউ প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করেছিলেন, সভা আয়োজন করতে সম্রাট আকবরের রাজকোষের প্রয়োজন হয় না। ইচ্ছা থাকলেই হয়। শুধু ইচ্ছাটা চানাচুরের প্যাকেটের বাইরে থাকতে হয়। এক মঞ্চে সকল প্রজন্ম! সভার শুরুতেই বিদেশে অবস্থানরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হলো। সবার মধ্যে একধরনের আগ্রহ কাজ করছিল। দীর্ঘদিন পর এমন একটি জায়গা তৈরি হয়েছে, যেখানে ছোট-বড় সবাই নিজেদের কথা বলতে পারবেন। এরপর মাইক তুলে দেওয়া হলো অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যাচগুলোর হাতে। ১৮২৫ থেকে শুরু করে ১৮১৮ পর্যন্ত একে একে বক্তব্য দিলেন ইউথ উইংয়ের সদস্যরা। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এল স্পোর্টস কাউন্সিলের প্রতি অভিযোগ, চেয়ার তৈরির অদ্ভুত খেলা, ছোটদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া এবং একটি আদর্শ অ্যালামনাই কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রত্যাশা। তাঁরা জানতে চাইলেন, যে সংগঠন সবার হওয়ার কথা, সেখানে সিদ্ধান্ত নেবে কেন শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজন? প্রশ্নটি অত্যন্ত সাধারণ। তবে সাধারণ প্রশ্নের একটি অসাধারণ সমস্যা আছে। এগুলোর উত্তর দিতে গেলে অনেক সময় অসাধারণ(!) মানুষদের সাধারণ চেহারা বেরিয়ে আসে। এরপর মাইক গেল মাঝের ব্যাচগুলোর হাতে। তাঁরা তুলে ধরলেন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অ্যালামনাই সংগঠনটি কীভাবে কার্যকর নেটওয়ার্কিংয়ের বদলে জলসাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। ১৮১১-১২ ব্যাচের প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্যে ব্যাখ্যা করলেন, কীভাবে একটি প্রশ্নবিদ্ধ সভার মাধ্যমে অ্যালামনাই গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তাঁরা বড় ভাইদের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিষয়টিও সামনে আনলেন। আলোচনায় উঠে এল প্রস্তাবিত বিপুল অঙ্কের রেজিস্ট্রেশন ফি নিয়েও আপত্তি। অন্যদিকে ১৮০৬ ও ১৮০৪ ব্যাচের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করলেন। শ্যাডো কমিটির ভূমিকা, আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব এবং একটি আদর্শ অ্যালামনাই কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত—এসব বিষয় নিয়ে তাঁরা নিজেদের মতামত তুলে ধরলেন। বিদেশ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া প্রাক্তনরাও একে একে বক্তব্য দিতে থাকলেন। সবার কথা শুনে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। মানুষ অ্যালামনাইয়ের বিরুদ্ধে নয়। মানুষ চায় একটি সুন্দর, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক অ্যালামনাই। যেখানে সংগঠন থাকবে সবার, কিন্তু রাজত্ব থাকবে কারও নয়। যাই হোক, এসব ছোটখাটো ঘটনা পেরিয়ে সবার মতবিনিময়ের মাধ্যমে অত্যন্ত সফলভাবে শেষ হলো সাধারণ সভা। বাঘের নীরবতা: এবার আসা যাক গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্রটির কাছে। আমাদের প্রিয় চন্দন চতুর। সেই চন্দন, যাঁর গর্জনে একসময় বাঘযুগ কেঁপে উঠত। মজার বিষয় হলো, চন্দন পুরো সাধারণ সভাটি আড়াল থেকে পর্যবেক্ষণ করলেন। কিন্তু একটি শব্দও করলেন না। কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো প্রতিবাদ নেই। কোনো গর্জন নেই। বাঘ যেন হঠাৎ বিড়ালে পরিণত হয়েছে। সম্ভবত চন্দন বুঝেছিলেন, এখানে মাইক হাতে নিলে শুধু গর্জন করলেই হবে না, প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে। আর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে নীরব থাকা অনেক সময় নিরাপদ। বিশেষ করে যখন বাঘের চামড়াটা নিজের নয়, ধার করা। সভা শেষ, এবার কী? সফল সাধারণ সভার পর অ্যালামনাইয়ের কর্মকাণ্ড কিছুদিনের জন্য স্থবির হয়ে পড়ল। এর মধ্যেও এনার্কির সদস্যরা কয়েক দফা চেষ্টা করলেন সংশ্লিষ্টদের বোঝাতে। কীভাবে একটি সুন্দর অ্যালামনাই গড়ে তোলা যায়, কীভাবে সবাইকে যুক্ত রাখা যায়, কীভাবে সংগঠনে স্বচ্ছতা আনা যায়—এসব নিয়ে তাঁরা আলোচনা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, কিছু মানুষকে বোঝানো যায় না। কারণ তাঁরা বুঝতে চান না। আমাদের আদু ভাইদের অবস্থাও ছিল অনেকটা তেমন। তাঁদের কাছে পরিবর্তন মানেই বিপদ। জবাবদিহি মানেই ষড়যন্ত্র। আর ছোটদের মতামত মানেই বেয়াদবি। শেষ পর্যন্ত এনার্কি ও ইউথ উইংয়ের সদস্যরা অনেকটা বিরক্ত হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন, পড়াশোনা ও কর্মজীবনে মনোযোগী হলেন। ইউথ উইংয়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা দেশের বাইরে চলে গেলেন। অন্যরাও নিজেদের ব্যস্ততায় ফিরে গেলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, যে মানুষ ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে মুঘল আমলে ফিরে যেতে চায়, তাকে আধুনিক যুগের গুরুত্ব বোঝানো সহজ নয়। তাই তাঁরা মাঠ ছাড়লেন। তবে মাঠ ছেড়ে দেওয়া আর হেরে যাওয়া এক বিষয় নয়। এই সহজ সত্যটি বোঝার জন্যও কিছুটা বুদ্ধির প্রয়োজন। দুই শ বছর পর বাঘের প্রত্যাবর্তন: এরপর কেটে গেল দীর্ঘ সময়। রূপকথার হিসাবে প্রায় দুই শ বছর। একদিন হঠাৎ বনের ভেতর থেকে আবার গর্জন শোনা গেল। চন্দন চতুর ফিরে এসেছেন! এবার তাঁর কণ্ঠে বিজয়ের সুর। তিনি ঘোষণা করতে শুরু করলেন, এনার্কি ও ইউথ উইং নাকি হেরে গেছে! কারণ অ্যালামনাই তো হয়েই গেছে! কী অসাধারণ যুক্তি! যে সংগঠন নিয়ে এত প্রশ্ন উঠেছিল, যে সংগঠনের কাঠামো, স্বচ্ছতা ও পরিচালনাপদ্ধতি নিয়ে এত আলোচনা হয়েছিল, সেই সংগঠনের অস্তিত্বকেই চন্দন নিজের বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে হাজির করলেন। এ যেন পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর না লিখে খাতা জমা দিয়ে বলা— “স্যার, আমি তো পরীক্ষা দিয়েছি। অতএব আমিই প্রথম!” চন্দন এখানেই থামলেন না। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এনার্কি ও ইউথ উইংয়ের নেতাদের অ্যালামনাইবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করলেন। অথচ পুরো আন্দোলনের মূল দাবিই ছিল একটি সুন্দর অ্যালামনাই গড়ে তোলা। এনার্কি কখনো বলেনি, অ্যালামনাই চাই না! তারা বলেছিল, অ্যালামনাই হোক সবার। ইউথ উইং কখনো বলেনি, বড়দের সম্মান করা হবে না। তারা বলেছিল, ছোটদের শ্রমেরও স্বীকৃতি দিতে হবে। যারা একটি অনুষ্ঠান সফল করতে পরিশ্রম করবে, তাদের যেন যথাযথ সম্মান ও সামনের সারিতে জায়গা দেওয়া হয়। পরবর্তী টুর্নামেন্টে অন্তত সেই সম্মানটুকু তারা প্রত্যাশা করেছিল। এ দাবি কি খুব অন্যায়? নাকি ছোটদের শ্রম নেওয়া যাবে, কিন্তু কৃতিত্ব দেওয়া যাবে না আর আদু ভাইদের কোন প্রশ্ন করা যাবে না—এটাই বাঘযুগের সংবিধান? চন্দন চান্দুর বিজয়: এনার্কি ও ইউথ উইংয়ের প্রতিবাদের কারণে বিপুল অঙ্কের রেজিস্ট্রেশন ফি নিয়ে অ্যালামনাই গঠনের পরিকল্পনা আগের মতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের প্রশ্নের কারণে অনেক মেধাবী প্রাক্তন শিক্ষার্থী সংগঠনটির কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। অনেকে বর্তমান অ্যালামনাইয়ের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় দুই বছরেও একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর কমিটি গঠনের প্রশ্নটি রয়ে গেছে। বরং দেখা যাচ্ছে দুই বছর স্পোর্টস কমিটির দায়িত্ব পালনের পর চন্দনের আশীর্বাদে আবারও দুই বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন বিক্রিয়া ছাড়খার। অ্যালামনাই যেন আটকা পড়েছে চন্দনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফাঁদে। এর মধ্যেই চন্দন চতুর ঘোষণা করছেন— তাঁরা নাকি শক্তভাবে দাঁড়িয়ে গেছেন! এনার্কি নাকি কিছুই করতে পারেনি! আহারে আমার চন্দন চান্দু! তোমার এই আত্মবিশ্বাস দেখে সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়। ইউথ উইংয়ের দুই নেতা দেশের বাইরে চলে গেছেন। এনার্কির সদস্যরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সবাই বুঝেছেন, তোমাদের মতো আদু ভাইদের সঙ্গে একই বিষয়ে অনন্তকাল তর্ক করে লাভ নেই। তাই তাঁরা সরে গেছেন। আর তুমি সেই ফাঁকা মাঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিশ্বজয়ী ঘোষণা করছ! যে মাঠে প্রতিপক্ষই নেই, সেখানে একা একা গোল দিয়ে বিশ্বকাপ জেতার আনন্দ সম্ভবত চন্দন ছাড়া আর কেউ বোঝে না। তবে চন্দনের একটা গুণ স্বীকার করতেই হবে। তিনি কখনো হার মানেন না। বিশেষ করে যখন তাঁকে হারানোর জন্য কেউ মাঠেই থাকে না। তিনি মাঝেমধ্যে ফিরে আসেন, গর্জন করেন, বিজয় ঘোষণা করেন এবং আবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে এনার্কি নাকি অ্যালামনাইবিরোধী। অথচ একটি প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া গেল না। যারা অ্যালামনাই চায়নি, তারা এত কষ্ট করে সবাইকে নিয়ে সাধারণ সভার আয়োজন করেছিল কেন? শেষ কথা: বাঘযুগের ইতিহাস! আট পর্বের এই দীর্ঘ গল্পে আমরা দেখলাম শামসে আরার পতন, শ্যাডো কমিটির উত্থান, চন্দন চতুরের বাঘযুগ, জলসা বাবাদের রাজনীতি, ইউথ উইংয়ের প্রতিবাদ এবং এনার্কির উদ্যোগে একটি সফল সাধারণ সভার আয়োজন। দেখলাম কীভাবে কিছু তরুণ একটি সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। আর কীভাবে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্নকারীদেরই সংগঠনবিরোধী বানানোর চেষ্টা চলেছে। ইতিহাসের একটি অদ্ভুত নিয়ম আছে। কিছু মানুষ ইতিহাস তৈরি করে। আর কিছু মানুষ ইতিহাস তৈরি হয়ে যাওয়ার পর এসে দাবি করে, সবকিছু নাকি তাদেরই পরিকল্পনা ছিল। চন্দন কোন দলে পড়েন, সেই সিদ্ধান্ত পাঠকদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো। তবে বাঘযুগের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এটাই— বাঘ ভেবেছিল, সবাই তাকে ভয় পেয়ে পালিয়েছে। অথচ কেউ তাকে বোঝায়নি, মানুষ মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়েও জায়গা ছেড়ে চলে যায়। কিংবা চন্দন ঠিক এটাই চেয়েছিল যাতে সে বাঘ নাই বনের বিড়াল রাজা হয়ে থেকে যাবার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালিয়ে যেতে থাকে। ⸻ আট পর্বের গল্প শেষে জনগণের আদালতে তিনটি প্রশ্ন! ১. আসলে কে হেরেছে? যারা একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও সবার অংশগ্রহণমূলক অ্যালামনাই চেয়েছিল, নাকি যারা প্রায় দুই বছরেও একটি কার্যকর কমিটি গঠনের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি? ২. এনার্কি কি সত্যিই অ্যালামনাইবিরোধী ছিল? নাকি তাদের প্রতিবাদ ছিল অ্যালামনাইয়ের আড়ালে কলকাঠি নাড়া, বিড়ালের স্বভাব নিয়ে বাঘের চাদর পরা কিছু মানুষের তৈরি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে? ৩. শামসে আরার পতন থেকে ঐতিহাসিক সাধারণ সভা পর্যন্ত—এই গল্পের প্রকৃত খলনায়ক কারা? যারা আড়াল থেকে রাজত্ব চালাতে চেয়েছিল? নাকি যারা সকল প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে এক মঞ্চে এনে কথা বলার সুযোগ তৈরি করেছিল? উত্তর জনগণই দেবেন। কারণ বাঘযুগে একটি বিষয় ভুলে যাওয়া হয়েছিল— বিড়াল নিজেকে বাঘ ঘোষণা করলেই বাঘ হওয়া যায় না। আর পরিস্থিতি পাল্টে যেতেও সময় লাগে না। Winter is coming 😉 সমাপ্ত
← সব গল্পে ফিরে যানবিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার গল্প / পর্ব 08
রাজকীয় সভা
সম্পূর্ণ সত্য ঘটনার অবলম্বনে
সম্পূর্ণ লিখিত গল্প