পূর্বের দুই অধ্যায় থেকে এতটুকু আন্দাজ করা যায় যে ফুটবল টুর্নামেন্ট শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শান্তি শেষ হয়েছে তারও আগে! টুর্নামেন্টের ফাইনালে এমন কিছু কাণ্ডকারখানা ঘটেছে, যার পর থেকে অ্যালামনাইয়ের বাতাসেও একটা অস্বস্তিকর গন্ধ। অবশ্য সেটা বিপ্লবের গন্ধ, নাকি চন্দন বাবুর ঘামের গন্ধ, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। একদিকে এনার্কি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে নিজেদের দল গোছাচ্ছে। অন্যদিকে যেসব তরুণ এত দিন ফুটবল, জার্সি আর গোলপোস্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তারা এখন রীতিমতো ক্ষুব্ধ। তাদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, ফুটবল খেলতে এসে ভুল করে স্বাধীনতাযুদ্ধে নাম লিখিয়ে ফেলেছে! সবচেয়ে বিপদে আছেন আমাদের চন্দন বাবু এবং তাঁর বিশ্বস্ত বডিগার্ড বিক্রিয়া ছাড়খার। চন্দন বাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ। বিক্রিয়ার কপালেও ভাঁজ। তবে বিক্রিয়ার ভাঁজটা অভ্যাসগত কারণে, নাকি কর্মফলের টেনশনে, সেটা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। চন্দন বাবু বুঝতে পারছেন, তাঁর কপালে শনি ঘুরঘুর করছে। এই তরুণেরা যদি আবার বিপ্লব করে বসে, তাহলে এত দিনের বাঘের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তিনি বিক্রিয়াকে ডেকে বললেন, — বিক্রিয়া, পোলাপান এত চুপচাপ কেন? বিক্রিয়া কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, — ভাই, মনে হয় সবাই বাসায় গেছে। — বাসায় গেলে আমার এত ভয় লাগতেছে কেন? — ভাই, আপনার ভয় পাওয়ার অভ্যাস আছে। চন্দন বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সমস্যা হলো, তরুণেরা কী করতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তাঁদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। এদিকে এনার্কি কী প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটাও অজানা। অর্থাৎ চন্দন বাবু এমন এক যুদ্ধের সেনাপতি, যিনি জানেন না যুদ্ধ কার সঙ্গে, কোথায় হবে, কিংবা আদৌ তাঁকে কেউ যুদ্ধে ডাকবে কি না! এদিকে তরুণ সমাজ বসে নেই। আরও একবার মিটিং ডাকা হলো। ১৮ থেকে ২৫ ব্যাচের তরুণেরা সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আরও কয়েকজন সিনিয়র ভাই। যাঁরা বয়সে বড়, অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং অ্যালামনাইয়ের আজব কাণ্ডকারখানা দেখে ইতিমধ্যে জীবনের অনেক আশা ছেড়ে দিয়েছেন। মিটিংয়ের পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর। সবাই এক সারিতে বসেছে। কেউ কাউকে ধমকাচ্ছে না। কেউ নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা দাবি করছে না। কেউ বলছে না, ‘এই অ্যালামনাই আমার হাতে গড়া!’ ইউথ উইংয়ের বিপ্লবটা আবারও শুরু হয় এই জায়গা থেকে! অন্যদিকে এনার্কির উত্থানের গল্প বলতে গেলে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। তখনও ফুটবল টুর্নামেন্ট চলছে। আগেই বলেছিলাম, এনার্কির সদস্যরা প্রায় প্রতিদিনই মিটিংয়ে বসত। মিটিংয়ের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল একটাই—এই লোকগুলোর আসল উদ্দেশ্য কী? এরকমই একদিন, টুর্নামেন্টের চরম গোজামিল অবস্থায়, ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা ঘটল। গঠিত হলো কিংবদন্তি, বিশ্ববিখ্যাত, আলাদিনের চিরাগপ্রাপ্ত আলিবাবার চল্লিশ চোরের দল! এই চক্রে ছিল শ্যাডো কমিটি এবং প্রকাশ্য আহ্বায়ক কমিটিতে তাদের নিয়ন্ত্রিত পুতুল সদস্যরা। তবে এখানে একটা সংশোধন প্রয়োজন। দলে ঠিক চল্লিশজন ছিল না, আর সবাই চোরও ছিল না। বরং বেশ কয়েকজন অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। বাকিদের মধ্যে একটা বড় অংশ ছিলেন সহজ-সরল প্রকৃতির। এতটাই সহজ-সরল যে, তাঁদের সামনে কেউ দিনের বেলায় হারিকেন জ্বালিয়ে বললেও বিশ্বাস করতেন—বিদ্যুৎ চলে গেছে! তাঁরা স্কুলকে ভালোবাসতেন। স্কুলের প্রতি তাঁদের আবেগ ছিল খাঁটি। আর সেই আবেগের সুবাদেই নান্টু দা, চন্দন বাবু ও ছাড়খার সাহেবকে তাঁদের বেশ পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। প্রকাশ্য আহ্বায়ক কমিটিতে একজন ভালো মানুষ ছিলেন, নাম সাবেরা আপা। তিনি আহ্বায়ক কমিটি থেকে পদত্যাগও করেছিলেন। সাবেরা আপা দীর্ঘদিন চন্দন বাবুদের সঙ্গে ছিলেন। তবে হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে পাবলিক ফোরাম থেকে লেফট মেরে দিলেন! ঘটনাটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। কারণ চন্দন বাবুদের সঙ্গে থাকা যে কয়েকজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ছিল, সাবেরা আপা তাঁদের একজন। তাই তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়াটা অনেকের মনেই প্রশ্ন তৈরি করল। ঠিক পরদিন শুক্রবার। পবিত্র দিন। সকালবেলা। মনে পবিত্রতা নিয়ে প্রায় ২০০০ মানুষের বিশাল পাবলিক ফোরামে বড় ফাহাদ অত্যন্ত ভদ্রভাবে একটি প্রশ্ন করলেন— “আচ্ছা, সাবেরা আপা হঠাৎ গ্রুপ থেকে চলে গেলেন কেন?” প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ। এর উত্তর দিতে বড়জোর দুই লাইন লাগার কথা। কিন্তু প্রশ্নকর্তা তখনও জানতেন না, তিনি আসলে প্রশ্ন করেননি, ভুল করে আলিবাবার গুহার দরজায় ধাক্কা দিয়েছেন! আর সেই গুহার পাসওয়ার্ড ছিল—চিচিং ফাঁক নয়, প্রশ্ন করা নিষেধ! ব্যস! এই একটা প্রশ্ন থেকেই শুরু হলো বিপত্তি! একজনের দেখাদেখি বাকিরাও প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। এদিকে ইউথ উইংয়ের সদস্যরা চুপচাপ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন। কারণ এনার্কির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তখনও তাঁদের পরিষ্কার ধারণা ছিল না। তবে একটা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে এত ভয় কিসের, সেটাও তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না! এদিকে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। চন্দন বাবু আর নান্টু দাদার ভাবখানা এমন, যেন তাঁরা এইমাত্র পৃথিবীতে এসেছেন। অ্যালামনাই কী, ফোরাম কী, সাবেরা আপাই বা কে—কিছুই তাঁদের জানা নেই! অবশেষে রাজা নান্টু আর চন্দন বাবুর রাজ্য রক্ষায় কোথা থেকে যেন কাকপক্ষীর পালের মতো উড়ে এলেন কয়েকজন পার্শ্বচরিত্র! তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাবলা ভাই, যিনি আবার মূল কমিটির বড় পদেও আছেন। সঙ্গে মখলিস ভাই। আরও কয়েকজন ছিলেন, তবে তাঁদের নাম মনে রাখার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাঁরা এসে জবাব দিতে শুরু করলেন। জবাবের সঙ্গে প্রশ্নের সম্পর্ক খুব একটা ছিল না। তবে আত্মবিশ্বাসের কোনো অভাব ছিল না। পৃথিবীতে একশ্রেণির মানুষ আছেন, যাঁরা উত্তর জানেন না বলে কখনো কথা বলা বন্ধ করেন না। এঁরা সম্ভবত সেই শ্রেণির। এদিকে প্রশ্ন বাড়ছে। জবাবদাতাদের অবস্থা করুণ। প্রশ্নকারীরা শিষ্টাচার ঠিক রেখে ধারালো যুক্তি দিয়ে আদু ভাইদের অস্বস্তি বাড়াতে লাগল আর সাধারণ মানুষের সামনে হাঁড়ির ভেতরের অবস্থা পরিষ্কার হয়ে যাওয়া শুরু হলো। ফাইনাল শেষে এই প্রশ্ন-উত্তরের বিতর্কের মধ্যেই ঘটল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। গ্রুপ বন্ধ! ২০০০ মানুষের ফোরামে কেউ আর মেসেজ দিতে পারছে না! ব্যাপারটা অনেকটা এমন, পরীক্ষার হলে ছাত্ররা কঠিন প্রশ্ন করেছে, আর শিক্ষক উত্তর না পেয়ে পরীক্ষার হলেই তালা মেরে দিয়েছেন! এরপর শুরু হলো খোঁজখবর। গ্রুপ বন্ধ করল কে? জানা গেল, এর পেছনেও নাকি চন্দন বাবু আর নান্টু দাদার হাত রয়েছে! অভিযোগ উঠল, তাঁরা মূল কমিটিকে চাপ দিয়ে গ্রুপ বন্ধ করিয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আর তাদের আসল চেহারা সবার সামনে না আসে। অথচ তাঁদের ভাবখানা এমন, যেন গ্রুপ বন্ধ হওয়ার খবর শুনে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন! চন্দন বাবুদের এই অভিনয় দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে নিরীহ মানুষের সংখ্যা যদি কখনো কমে যায়, তাহলে তাঁদের দুজনকে জাদুঘরে সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু আসল ঘটনা তখনও বাকি! এই ঘটনার পরই জানা গেল, মূল অ্যালামনাইয়ের পেছনে নাকি আরও একটি অ্যালামনাই আছে! অর্থাৎ একটা প্রকাশ্য আহ্বায়ক কমিটি, আরেকটা অদৃশ্য শ্যাডো কমিটি! প্রকাশ্য কমিটিতে ছিলেন কয়েকজন সামাজিকভাবে সম্মানিত সিনিয়র এবং কয়েকজন সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ব্যক্তি। তাঁদের সামনে রেখে আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করত শ্যাডো কমিটি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, বাড়ির মালিক একজন, কিন্তু বাড়ির চাবি থাকে পাশের বাসার চাচার কাছে! ততদিনে ফুটবল টুর্নামেন্ট শেষ। ইউথ উইংয়েরও বুঝতে বাকি রইল না, মূল অ্যালামনাইয়ের আড়ালে গড়ে উঠেছে আরেকটি গোপন রাজদরবার। সেই দরবারের কথিত প্রধান চরিত্ররা হলেন চন্দন বাবু, নান্টু দাদা, গুপ্ত জ্যাক, বিক্রিয়া ছাড়খার আর ভাইপার! এতদিন বিষয়টা ছিল সন্দেহ। কিন্তু সন্দেহের অবসান ঘটল যখন গুপ্ত জ্যাক নিজেই এনার্কিকে জানিয়ে দিলেন, ভেতরে ভেতরে আরেকটি গোপন কমিটি তৈরি হয়েছে! তিনিও সেই শ্যাডো কমিটির সদস্য। এনার্কির সঙ্গে যুক্ত হলেও শ্যাডো কমিটি ছাড়েননি। বরং ভেতরে কী চলছে, সেটাই এনার্কির কাছে প্রকাশ করে দিলেন। মানুষের জীবনে কিছু খবর আছে, যা শুনে অবাক হতে হয়। আবার কিছু খবর আছে, যা শুনে মনে হয়—এটা তো আগেই বোঝা উচিত ছিল! এটি ছিল দ্বিতীয় ধরনের খবর। ব্যস! এবার এনার্কি আর ইউথ উইংয়ের কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। তাঁদের প্রতিবাদ মূল অ্যালামনাইয়ের বিরুদ্ধে নয়। প্রতিবাদ সেই অদৃশ্য শ্যাডো অ্যালামনাইয়ের বিরুদ্ধে, যারা পর্দার আড়াল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে! একদিকে এনার্কির অভিজ্ঞ সদস্যরা, অন্যদিকে ইউথ উইংয়ের তরুণেরা। দুই পক্ষ এবার এক হলো। এই কনফিউজিং পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে তারা বারবার একটি জেনারেল মিটিং আয়োজনের কথা বলছিলেন। কিন্তু হাবলা ভাই জানিয়ে দিলেন, সেটা নাকি কোনোভাবেই সম্ভব নয়! কেন সম্ভব নয়, সেই ব্যাখ্যা অবশ্য তিনি দেননি। সম্ভবত কিছু কিছু অসম্ভব কাজের ব্যাখ্যা দেওয়াটাও অসম্ভব। এদিকে এত ঘাপলার মধ্যে সবার মাথায় একটা সাধারণ প্রশ্ন জাগল—গোপনে গঠিত এই কমিটিতে আসলে কারা আছেন? প্রশ্নটা খুবই নিরীহ। কিন্তু আগেই বলা সেই গ্রুপে মেসেজ বন্ধের ঘটনায় প্রশ্ন করার পথটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মনে হলো, কমিটির সদস্যদের নাম জানতে চাওয়াটা কোনো সাধারণ প্রশ্ন নয়, বরং রাষ্ট্রের গোপন পরমাণু প্রকল্পের নথি চেয়ে বসার সমান অপরাধ! এতক্ষণে এনার্কির সদস্যদের কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হলো। এখানে অ্যালামনাই কমিটি বলতে আসলে কিছু নেই। সিনিয়ররা হয়তো কাগজে-কলমে আছেন, কিন্তু এই অমেধাবী শ্যাডো কমিটিই আসলে অ্যালামনাই! নইলে গ্রুপ বন্ধ করার মতো এত বড় স্পর্ধা তারা কোথা থেকে পান? চন্দন বাবুরা এতদিন ভেবেছিলেন, সবকিছু তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। তাঁদের ধারণা ছিল, তাঁরা যা বলবেন, বাকিরা তা মেনে নেবেন। কেউ প্রশ্ন করবে না। আর ভুল করেও কেউ প্রশ্ন করে ফেললে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, প্রশ্ন করার চেয়ে চুপ করে থাকা অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। কিন্তু তাঁরা একটা ছোট বিষয় ভুলে গিয়েছিলেন। মানুষকে কিছুদিন বোকা বানিয়ে রাখা যায়। দীর্ঘদিন বোকা বানিয়ে রাখতে হলে অবশ্য বোকাদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত, এনার্কির ছেলেরা সেই সহযোগিতা করতে রাজি ছিল না। চন্দন বাবুর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই। তিনি নিজেকে বাঘ ভাবতে শুরু করেছিলেন, অথচ জঙ্গলের বাকি প্রাণীরা যে ইতিমধ্যে তাঁর ডোরাকাটা চামড়ার হিসাব নিতে শুরু করেছে, সেটা তিনি টেরই পাননি! আর এই বিশাল ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই নিরীহ একটা প্রশ্ন দিয়ে— “সাবেরা আপা গ্রুপ থেকে চলে গেলেন কেন?” সাবেরা আপা সম্ভবত নিজেও জানতেন না, তাঁর একটা লেফট মারার ঘটনা একদিন অ্যালামনাইয়ের ইতিহাসে এত বড় অধ্যায়ের জন্ম দেবে!
← সব গল্পে ফিরে যানবিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার গল্প / পর্ব 07
আলিবাবা ও চল্লিশ চোর
সম্পূর্ণ সত্য ঘটনার অবলম্বনে
সম্পূর্ণ লিখিত গল্প