← সব গল্পে ফিরে যান
বিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার গল্প / পর্ব 03

গরিবি মজলিস

সম্পূর্ণ সত্য ঘটনার অবলম্বনে

সম্পূর্ণ লিখিত গল্প

স্কুল সংস্কার তখনো অফিসিয়াল হয়নি, প্রিন্সিপালের পদত্যাগও কাগজে-কলমে ঝুলে আছে। এর মধ্যে আন্দোলনের কিছু সাইড ইফেক্টও দেখা দিল। পঞ্চম শ্রেণির অবুঝ বালক দীপেন স্যারের ওপর হাত তুলে এমন এক কাণ্ড ঘটাল যে, আন্দোলনের চেয়ে এটা নিয়েই পাবলিকের আলোচনা বেশি! তরুণরা তখন ব্যস্ত সবকিছু লিগালাইজ করতে ও ডেমেজ ডিফেন্স করতে! তবে ইতিহাস বলে—আন্দোলন শেষ হলে মানুষ ঘরে ফেরে না, গ্রুপ খোলে। এখানেও ব্যতিক্রম হলো না। মোটামুটি চার প্রজাতির মস্তিষ্ক দেখা গেল। গ্রুপ–১: ইউথ উইং ১৮১৮ থেকে ১৮২৫ ব্যাচ। আন্দোলনের আসল ইঞ্জিন। তাদের মূল ভোকাল তানিম। সবাই তার কথা শুনত। সমস্যা একটাই—এই দলের রক্তের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে সামান্য বেশি! গ্রুপ–২: এনার্কি সিনিয়রদের দল। ছোটদের সামনে রেখে পেছন থেকে বুদ্ধি, সহযোগিতা আর সংস্কারের প্ল্যান দিত। সঙ্গে কিছু ইয়াং মেধাবীও ছিল। এরা চেয়ার দখলের আগে স্কুলটা ঠিক করার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। গ্রুপ–৩: আম পাবলিক আন্দোলনে ছিল না, কিন্তু সমালোচনায় ছিল শতভাগ উপস্থিত। অবশ্য তাদের কথাও ফেলে দেওয়া যায় না—স্কুল সবার, তাই কথা বলার অধিকারও সবার। গ্রুপ–৪: আলাদিনের চিরাগ পার্টি প্রিন্সিপাল যেতেই এদের চোখে নতুন দুনিয়া খুলে গেল—“অ্যালামনাই কবে হবে?”, “চেয়ার কয়টা?”, “পজিশন কার?” দুই দিন আগেও যারা স্কুলে ঢুকতে পারত না, তারা এখন স্কুল চালানোর নকশা নিয়ে হাজির! এই দলের উল্লেখযোগ্য মুখ—বিক্রিয়া ছাড়খার, চন্দন, নান্টু দাদা এবং রহস্যময় গুপ্ত জ্যাক। হঠাৎ একদিন গণমাধ্যমে ভেসে এলো বিশিষ্ট নেতা বিক্রিয়া ছাড়খার সাহেবের নোটিশ—“জেনারেল মিটিং আহ্বান!” নোটিশ দেখে তরুণরা প্রথমে অবাক, পরে আরও অবাক। ইউথ উইংয়ের মুখে প্রশ্ন —“স্কুলের জেনারেল মিটিং ডাকার উনি কে?” এতদিন আন্দোলনের ছোট-বড় সব সিদ্ধান্ত আলোচনা করে হয়েছে। আর এখন কোনো আলোচনা নাই, ফোন নাই, মেসেজ নাই—সরাসরি নোটিশ! এমন ভাব, স্কুলের দলিলপত্র সম্ভবত ছাড়খার সাহেবের বালিশের নিচে! ইউথ উইংয়ের নিক্সন, দেওয়ান হামজা আর তানিম ফোন দিল ছাড়খার সাহেবকে। —“ভাই, কিসের মিটিং? আমাদের তো কিছুই বলা হয় নাই!” ছাড়খার সাহেব অত্যন্ত রাষ্ট্রীয় কণ্ঠে জানালেন, —“চন্দন ভাইয়ের সাথে আলোচনা করেই দিয়েছি। আমজনতা বলছে আন্দোলন একটু অতিরঞ্জিত হয়ে গেছে। তাই বিচারসভা হবে, তারপর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।” তিনজন কিছুক্ষণ চুপ। তারপর নিক্সন, —“যা বাবা! মাফিয়া নামাইলাম আমরা, তখন সবার অনুমতি নেওয়া হয় নাই—এইটা অপরাধ। আর মাফিয়া নামানোর সময় যারা টয়লেটের মাঝখানে আত্মগোপনে ছিল, তারা এখন বিচারক!” দেওয়ান হামজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —“লিডার হয়ে গেছে—তাও মেনে নিলাম। কিন্তু আন্দোলন আমরা করলাম, এখন আমাদের আন্দোলনের বিচারও উনারাই করবেন?” আবার ওই আন্দোলনে উপস্থিত তারা নিজেরাই ছিলেন! তানিম শান্তভাবে বলল, “দুই দিন আগে মানুষ নোটিশ পড়ত—এখন মানুষ নিজেই নোটিশ দেয়!” সবাই আবার চুপ। কারণ তারা বুঝতে পারল— প্রিন্সিপাল নামানোর আন্দোলন শেষ হয়েছে। এখন শুরু হয়েছে ‘কে কাকে নামাবে’ আন্দোলন! যাই হোক, সবাই মিটিংয়ে গেল। এনার্কির কিছু লোকও ছিল, যারা ইউথ উইংয়ের কথার সঙ্গে মোটামুটি একমত। গিয়ে তরুণরা প্রথমেই পরিবেশ দেখে একটু হতাশ হলো। আয়োজন অত্যন্ত গরিবি, কিন্তু সামনের সারিতে বসা মানুষের ভাবভঙ্গি অত্যন্ত রাষ্ট্রীয়! সামনে আবার কয়েকটি সম্পূর্ণ অপরিচিত মিডিওকার চেহারা। এর মধ্যে অন্যতম ১৮০৬ ব্যাচের গুপ্ত জ্যাক। সঙ্গে নান্টু দাদা। তরুণদের মনে প্রথম প্রশ্ন— “এনারা আবার কোন এপিসোডে ঢুকলেন?” ব্যবস্থা এমন—সব সিনিয়র সামনে বসে ভাষণ দেবেন, পোলাপান পেছনে বসে জ্ঞান অর্জন করবে। একেবারে আধুনিক সালিশি মজলিস। চন্দন ভাইও উপস্থিত। তবে তাঁর চেহারা দেখে মনে হলো, তিনি আজকেই প্রথম জানতে পেরেছেন যে এখানে একটা মিটিং হচ্ছে। এমন নির্দোষ মুখ—যেন ভুল করে পাশের বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে এই রুমে ঢুকে পড়েছেন! মিটিং শুরু হলো। বক্তব্য মোটামুটি এমন— “প্রিন্সিপাল গেছে, আমরা সবাই খুশি, আমরা সবাই প্রাউড। কিন্তু আন্দোলনের সময় মব একটু অতিরঞ্জিত হয়েছে। আমাদের যদি একটা অফিসিয়াল অর্গানাইজেশন থাকত, তাহলে হয়তো এসব হতো না। তাই অতি শীঘ্রই অ্যালামনাই অর্গানাইজেশন দরকার।” শুধু প্রস্তাব দিয়েই থামলেন না। খসড়াও রেডি করে নিয়ে এসেছেন! তরুণরা তখন বুঝল—তাদের এখানে মতামত দিতে ডাকা হয়নি। খসড়া শোনার সৌভাগ্য অর্জনের জন্য ডাকা হয়েছে। পেছন থেকে ছোট্ট এক ছেলে ফিসফিস করে বলল, —“এতদিন অ্যালামনাই করতে উনাদের আটকাইছিল কে ভাই?” প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই কেউ উত্তর দিল না। এরপর ঘোষণা এলো— —“যারা যারা অ্যালামনাই চাও, হাত তোলো!” ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা। জুনিয়রদের হাত উঠল না। শুধু ১৮১৯ ব্যাচের অনেকে হাত তুলল। তাদের অবশ্য আলাদা অবস্থান ছিল। তারা মনে করত আন্দোলনে ঠিকভাবে চেইন অব কমান্ড মেইনটেইন হয়নি। তানিমের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও ভালো, যদিও নিজেদের মধ্যে কিছু ব্যক্তিগত ভুল বোঝাবুঝি ছিল। ১৮১৮, ১৯, ২০ এমনিতেই কাছের ব্যাচ—এসব টুকটাক ঝামেলা তাদের নিজেদের ব্যাপার, এই মিটিংয়ের বিষয় না। কিন্তু সমস্যা হলো—আয়োজকেরা সম্ভবত কল্পনায় পুরো রুমের হাত আগেই ওপরে দেখে ফেলেছিলেন। বাস্তবে হাত উঠল না। তাদের মুখের অবস্থা তখন এমন হলো, যেন বিরিয়ানি রান্না করে ২০০ জনকে দাওয়াত দিয়ে শেষে দেখা গেছে এসেছে সাতজন! ঠিক তখনই আসমান থেকে নাজিল হওয়া চরিত্র নান্টু দাদা প্রশ্ন করলেন— —“তোমরা অ্যালামনাই চাও না কেন?” তানিম উঠে দাঁড়াল। —“আমরা অ্যালামনাই চাই না, বিষয়টা এমন না। আন্দোলন মাত্র শেষ হয়েছে। কিছুদিন যাক। এখনই চেয়ার বানানোর দরকার কী? চেয়ার তৈরি হলে ক্ষমতা তৈরি হবে, ক্ষমতা তৈরি হলে আবার সেই চেয়ার নিয়েই নতুন আন্দোলন শুরু হবে!” রুম একটু চুপ। তানিম “আর ভবিষ্যতে অ্যালামনাই হলেও আমরা চাই না শুধু সিনিয়রিটির হিসাবে সবকিছু হোক। যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষ সামনে আসুক। ইয়ুথ এনার্জি সামনে থাকুক। কারণ মাঠে কাজটা তারাই করেছে। সিনিয়ররা পাশে থাকুক—দিকনির্দেশনা দিক, অভিজ্ঞতা দিক।” কথা শেষ। রুম আবার নীরব। এর মধ্যেই কথায় মিল-অমিল থেকে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে শুরু হলো তুমুল কথাকাটাকাটি। মুহূর্তের মধ্যে জেনারেল মিটিং রূপ নিল প্রায় WWE-এর প্রেস কনফারেন্সে! পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেল যে পুরো ইউথ উইং একসাথে ওয়াকআউট! সাথে সাথে রুম প্রায় খালি। এদিকে বিশিষ্ট নেতা বিক্রিয়া ছাড়খার তাঁর বাইসেপের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে টেবিলে এক ঐতিহাসিক বাড়ি দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। টেবিল নির্দোষ ছিল, তবুও আন্দোলনের যাবতীয় দায় আপাতত তাকেই নিতে হলো! এছাড়াও ছাড়খারের বন্ধু ভাইপারও কঠিন হুংকার দিল! এনার্কি ও কয়েকজন সিনিয়র দৌড়ে গিয়ে ইউথ উইংকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আবার রুমে আনলেন। ফিরতেই নান্টু দাদা চূড়ান্ত বাণী দিলেন— —“অ্যালামনাই আমরা করবই! তোমরা থাকো আর না থাকো!” তরুণরা বুঝল, মতামত নেওয়ার পর্বটি সম্ভবত খসড়াতেই ছিল না। শেষ পর্যন্ত অ্যালামনাই নিয়ে আলোচনা বাদ দিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল ১৮১৯ আর ইউথ উইংয়ের ঝামেলা মেটাতে। এই করতে করতে রাত শেষ। সবাই ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরল। কিছুক্ষণ পর নেট জগতে একটি সুন্দর আলোকচিত্র ভেসে উঠল— “সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ জেনারেল মিটিং সম্পন্ন।” ছবিতে সবাই পাশাপাশি। ছবি দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই—কিছুক্ষণ আগেই অর্ধেক মানুষ ওয়াকআউট করেছিল, টেবিল মার খেয়েছিল, আর অ্যালামনাই জন্ম নেওয়ার আগেই প্রায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল! সহজে বলতে গেলে পিউর Propaganda.