← সব গল্পে ফিরে যান
বিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার গল্প / পর্ব 04

বাঘের জলসা

সম্পূর্ণ সত্য ঘটনার অবলম্বনে

সম্পূর্ণ লিখিত গল্প

সোজাসাপ্টা বলতে গেলে, এতসব ঘটনার পর ফ্রন্টলাইনে থাকা তরুণদের মনটাই ভেঙে গেল। যে উৎসাহ নিয়ে তারা মাঠে নেমেছিল, মিটিংয়ের পর সেই উৎসাহের অবস্থা হলো সরকারি অফিসের নষ্ট প্রিন্টারের মতো—আছে, কিন্তু কাজ করে না। সবাই বাসায় ফিরে গেল। এরপর সামাজিক মাধ্যমে খোলা হলো বিশাল এক গ্রুপ। আর সেখান থেকেই শুরু হলো চন্দন বাবু ও তাঁর সতীর্থদের বহুল প্রতীক্ষিত বাঘযুগের অফিসিয়াল সূচনা! যদিও বাঘের সংখ্যা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। বিড়ালও যদি দীর্ঘদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, একসময় নিজেকে বাঘ মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। এই বাঘযুগের প্রধান চরিত্রগুলো ছিল আরও চমৎকার। নান্টু দাদা ছিলেন ক্রমশ আঁতেল প্রকৃতির মানুষ। খুব সাধারণ একটা বিষয় তাঁর হাতে পড়লে এমন বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ নিত যে, পাঁচ মিনিট পর মূল বিষয়টাই আর খুঁজে পাওয়া যেত না। Alumni নিয়ে আলোচনা করতে বসে তিনি এমন ভাব নিতেন, যেন বিশ্বব্যাংক তাঁর পরামর্শ ছাড়া পরবর্তী অর্থবছরের বাজেটই করবে না। অন্যদিকে গুপ্ত জ্যাকের নিজের সম্পর্কে ধারণা ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক। বিশেষ করে নিজের কাছেই। তিনি নিজেকে বেশ বড় মাপের লিডার মনে করতেন। কত বড় লিডার—এই বিষয়ে অবশ্য জনসাধারণের মধ্যে ঐকমত্য ছিল না। নেতৃত্ব দেওয়ার লোক পাওয়া না গেলেও তাঁর নেতা হওয়ার আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি ছিল না। পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্মায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য, আর কিছু মানুষ জন্মায় নিজেকে নেতা ভাবার জন্য। গুপ্ত জ্যাক দ্বিতীয় শ্রেণির একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি। আর চন্দন বাবু ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। চতুর, অস্থির এবং পরিস্থিতি বুঝে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ভয়ংকর প্রতিভাবান। বাতাস কোনদিকে বইছে সেটা আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগে তিনি বুঝে ফেলতেন। তাঁর নীতি ছিল শক্ত—শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী দিক পরিবর্তন করত। সহজ ভাষায় বলতে গেলে কঠিন সুবিধাবাদী! বিক্রিয়া ছাড়খার অবশ্য দেখতে-শুনতে সুন্দর, কথাবার্তায় সাবলীল এবং একটু আবেগপ্রবণ মানুষ। নিজের সামাজিক ইমেজের প্রতিও তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল। এতটাই গভীর যে, কোথাও ক্যামেরা থাকলে তাঁর ব্যক্তিত্বে আলাদা একটা জাতীয় দায়িত্ববোধ চলে আসত। তাঁর নামে আগে বড় অঙ্কের টাকা-পয়সা নিয়ে কেলেঙ্কারির অভিযোগও শোনা গিয়েছিল। অভিযোগ কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যা, সেটা কেউ নিশ্চিতভাবে জানত না। তাই সেটাকে অভিযোগ হিসেবেই রাখা ভালো। সব মিলিয়ে সমস্যা ছিল ভয়াবহ। কারণ যে সংগঠন নিয়ে এত স্বপ্ন, এত মিটিং, এত তর্ক, এত টেবিল চাপড়ানো—সেটা বাস্তবায়নের ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে ছিল এমন কিছু মানুষ, যাদের Alumni সম্পর্কে ধারণা ছিল অত্যন্ত নিষ্পাপ। তাদের কাছে Alumni মানে— একটা অনুষ্ঠান হবে। নাচ হবে। গান হবে। খাওয়া হবে। ছবি উঠবে। তারপর রাতে ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে দিয়ে লেখা হবে— “A Successful Alumni Gathering.” ব্যস। সফলতা সম্পন্ন। Networking বলতে তাঁরা সম্ভবত বুঝতেন নিজেদের মতো আরও কয়েকজন আনট্যালেন্টেড মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। একজন আরেকজনকে বলবে, “ভাই সামনে একসাথে বড় কিছু করতে হবে।” অন্যজন মাথা নেড়ে বলবে, “অবশ্যই ভাই।” তারপর দুজনই বাসায় চলে যাবে। সেই “বড় কিছু” আর কোনোদিন পৃথিবীর আলো দেখবে না। একটা শক্তিশালী Alumni network কীভাবে জুনিয়রদের career opportunity দিতে পারে, mentorship তৈরি করতে পারে, বিভিন্ন profession-এর মানুষকে connect করতে পারে, scholarship, employment কিংবা institutional development-এ কাজে লাগতে পারে—এই ধারণাগুলো সম্ভবত তাঁদের কাছে অতিরিক্ত আধুনিক ছিল। Mass networking নামের বিষয়টা হয়তো কোনো একদিন তাঁদের মস্তিষ্কের দরজায় কড়া নেড়েছিল। ভেতর থেকে কেউ দরজা খোলেনি। কারণ সবাই তখন ব্যস্ত ছিল— জলসায় কে গান গাইবে, কে নাচবে এসব আবোলতাবোল জিনিস নিয়ে! হঠাৎ এত কিছু ঘটতে দেখে আসল ট্যালেন্টরা আর সামনে আসলেন না। তাঁরা সম্ভবত দূর থেকে পরিস্থিতি দেখছিলেন এবং মনে মনে বলছিলেন—“দেখি, পাগলগুলো কতদূর যায়।” এর মধ্যেই অ্যালামনাই থেকে উপর উপর ঘোষণা এলো—ফি হবে ২০০০ টাকা! অফিসও নাকি ভাড়া নেওয়া হবে। অফিস কেন লাগবে, অফিসে কে বসবে, বসে কী করবে—এসব ছোটখাটো প্রশ্নের উত্তর অবশ্য কারও কাছে নেই। তবে আয়োজন দেখে মনে হচ্ছিল, অ্যালামনাই না—নতুন কোনো বহুজাতিক কোম্পানি বাজারে নামছে। এরপর আছে জলসা। নাচ-গান, আড্ডা, অনুষ্ঠান। তার জন্য আলাদা টাকা। ইভেন্ট হলে আবার ফান্ড রেইজিং তো থাকবেই। সব মিলিয়ে আমজনতার মনে একটা ছোট্ট প্রশ্ন জন্ম নিল— “ভাই, বাপ-দাদার সম্পত্তি ভাগ হচ্ছে নাকি?” আগের পর্বেই বলা হয়েছিল, ততদিনে তিনটা আলাদা ধারা তৈরি হয়েছে—আমজনতা, এনার্কি আর ইউথ উইং। আমজনতার বেশিরভাগেরই এই বন্দোবস্ত পছন্দ হলো না। বিশেষ করে কিছু স্মার্ট ও ইন্টেলেকচুয়াল মানুষ নিজেদের মধ্যে বসে হিসাব করার চেষ্টা করলেন। হিসাব মিলল না। তাঁরা প্রশ্ন করলেন। প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন করলেন। একপর্যায়ে বুঝলেন—এই জায়গায় প্রশ্ন করাটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় অপরাধ। ফলে আমজনতার একটা অংশ ধীরে ধীরে এনার্কির দিকে চলে গেল। অন্যদিকে ইউথ উইংয়ের বেশিরভাগ এসব থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখল। তবে কিছু তরুণ আলাদিনের চিরাগ পার্টির জলসায় বেশ আকৃষ্ট হলো। তাদের দোষও দেওয়া যায় না। বয়স কম। এই বয়সে অডিট রিপোর্টের চেয়ে নাচ-গান, আড্ডা আর নেটওয়ার্কিং বেশি আকর্ষণীয় লাগাটাই স্বাভাবিক। সমস্যা হলো, আলাদিনের চিরাগ পার্টি একটা ছোট্ট বিষয় বুঝতে ভুল করেছিল— অ্যালামনাই মানে আবার স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে ফিরে যাওয়া না। অ্যালামনাই মানে পুরোনো সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে একটা শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং ইনক্লুসিভ নেটওয়ার্ক তৈরি করা। কিন্তু স্বচ্ছতার জায়গায় যখন কুয়াশা বাড়তে শুরু করল, এনার্কির লোকজন নড়েচড়ে বসল। এনার্কি দলটা আবার সাধারণ দল না। মাথায় বুদ্ধি আছে, সময় আছে, প্রশ্ন করার বদঅভ্যাস আছে—আর সবচেয়ে ভয়ংকর সাথে ইউথ উইংয়ের সাপোর্টও আছে। তারা ঠিক করল—এই জিনিসের শেষ দেখে ছাড়বে। তবে এনার্কি বনাম ভাইয়া পার্টির লড়াই মোটেও সহজ ছিল না। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইয়া পার্টি তখন এক অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী। ঘটনা যেই ঘটাক, পোস্ট তাদের। কাজ যেই করুক, ছবি তাদের। আর ইতিহাস যেই লিখুক—নায়কও তারাই। এমনকি প্রিন্সিপাল নামানোর গল্পেও এমনভাবে ক্রেডিট নেওয়া শুরু হলো, মনে হয় এক সকালে ভাইয়ারা ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে বলেছিলেন— “প্রিন্সিপালটা নামিয়ে দিলে কেমন হয়?” তারপর বিকেলের মধ্যেই বিপ্লব শেষ! বাস্তবে কে মাঠে ছিল, কে তথ্য জোগাড় করেছিল, কে ঝুঁকি নিয়েছিল—এসব ইতিহাসের ছোটখাটো ফুটনোট। ফেসবুকের ইতিহাসে সত্য একটাই— যার পোস্ট সুন্দর, বিপ্লবও তার। এনার্কি তখন বুঝে গেল— তাদের লড়াই শুধু একটা সংগঠনের বিরুদ্ধে না। তাদের লড়াই এমন এক আলাদিনের চিরাগের বিরুদ্ধে, যেখানে চিরাগ ঘষলেই তিনটা জিনিস বের হয়— ক্রেডিট, প্রোপাগান্ডা আর একটা গ্রুপ ছবি। এনার্কি আর ইউথ উইং তখনও ভদ্রতা ছাড়েনি। সম্মান রেখেই প্রশ্ন করছিল— টাকা কোথায় যাবে? এত বড় আয়োজন কেন? সবকিছু একটু স্বচ্ছ হলে সমস্যা কী? আলাদিনের চিরাগ পার্টি বুঝল, এই রোগের চিকিৎসা আলোচনা দিয়ে সম্ভব না। প্রশ্নের উত্তর দিলে আবার নতুন প্রশ্ন আসে। তাই তারা বের করল তাদের তুরুপের তাস—স্কুল মাঠে ফুটবল টুর্নামেন্ট! বলে রাখা ভালো, প্রাক্তনদের ফুটবল টুর্নামেন্ট নতুন কোনো আবিষ্কার না। ১৮১৯ সাল থেকেই মোটামুটি সবাই মিলে এসব আয়োজন করে আসছে। কিন্তু এবার ব্যাপারটা আলাদা। প্রায় দশ বছর পর স্কুলের মাঠে বড় করে টুর্নামেন্ট! এই একটা লাইনের মধ্যেই ভয়ংকর আবেগ আছে। যে লোক গতকাল পর্যন্ত হিসাব চাইছিল, সেও পুরোনো স্কুল মাঠের কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য হিসাব ভুলে যাবে। যে ইয়াং ছেলেটা গতকাল বলেছিল, “সবকিছু ট্রান্সপারেন্ট হওয়া দরকার”—সে আজ জার্সির ডিজাইন নিয়ে ব্যস্ত। মানুষ বড়ই আবেগপ্রবণ প্রাণী। আর প্রাক্তন ছাত্র হলে তো কথাই নেই। স্কুল মাঠ দেখলে বয়স দশ বছর কমে যায়, হাঁটুর ব্যথা সাময়িকভাবে চলে যায় এবং পেট বের হওয়া মধ্যবয়সী মানুষও নিজেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ভাবতে শুরু করে। এই জায়গাতেই চন্দন, নান্টু আর বিক্রিয়া ছাড়খাররা দিলেন এক অস্থির চাল। পাবলিক সেন্টিমেন্ট + ইয়াং সেন্টিমেন্ট = ফুটবল। রাজনীতি পরে হবে, আগে বল ধরো! মুহূর্তেই পরিবেশ বদলাতে শুরু করল। প্রশ্নের জায়গায় জার্সি, স্বচ্ছতার জায়গায় ফিক্সচার, আর সাংগঠনিক বিতর্কের জায়গায় কে স্ট্রাইকার খেলবে—এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আলোচনা শুরু হলো। তারপর এলো বাজেট। লাখ লাখ টাকার ব্যাপারস্যাপার! সংখ্যাটা শুনে এনার্কির কয়েকজন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারা সম্ভবত মনে মনে হিসাব করছিল—ফুটবলটা কি সোনার তৈরি, নাকি ম্যাচ শেষে বিজয়ী দলকে স্কুল মাঠের দলিল লিখে দেওয়া হবে? কিন্তু আবেগ যখন মাঠে নামে, ক্যালকুলেটর তখন বেঞ্চে বসে থাকে। আর আলাদিনের চিরাগ পার্টি সেটা খুব ভালো করেই বুঝেছিল! এরপরই শুরু হয় যত সব নতুন সারকাস!