← সব গল্পে ফিরে যান
বিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার গল্প / পর্ব 05

ফুটবলনীতি

সম্পূর্ণ সত্য ঘটনার অবলম্বনে

সম্পূর্ণ লিখিত গল্প

সবাই আপাতত সবকিছু ভুলে টুর্নামেন্টের দিকে মনোযোগ দিল। মানুষের স্মৃতিশক্তি আসলেই অদ্ভুত। বড় বড় ঝামেলা ভুলতে সময় লাগে, কিন্তু সামনে ফুটবল টুর্নামেন্ট থাকলে কাজটা একটু দ্রুত হয়। আগেই বলেছিলাম, এই সংগঠনে ইন্টেলেকচুয়াল লোকের বেশ অভাব। ঘুরেফিরে একই চিন্তাধারার কিছু মানুষ। তাই এত বড় টুর্নামেন্টের জন্য একটা কমিটি করা হলো। নাম দেওয়া হলো—“স্পোর্টস কাউন্সিল”। নাম শুনে মনে হতে পারে, স্কুলের সাবেক খেলোয়াড়দের নিয়ে ভয়ংকর এক বোর্ড বসেছে। বাস্তবতা একটু ভিন্ন। কোনো আলোচনা নেই, কোনো ভোট নেই—একদিন আসমান থেকে নাজিল হওয়ার মতো করে কাউন্সিল হাজির! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, যাদের খেলাধুলার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজতে গেলে সম্ভবত গোয়েন্দা লাগবে, তারাই হয়ে গেলেন কাউন্সিলের মুখ্য চেহারা। প্রেসিডেন্ট বানানো হলো বিক্রিয়া ছাড়খারকে। ভদ্রলোক অবশ্য খেলাধুলা করেন। তবে মাঠের চেয়ে জিমে বেশি। সেই হিসেবে “বিক্রিয়া ছাড়খার” নামটা একটু অন্যায়। তাঁর নাম হওয়া উচিত ছিল—বডি ছাড়খার। এরপর দেখা গেল আরও কিছু আজগুবি পদ। সেখানেও খেলাধুলার লোকজনের দেখা নেই। গুপ্ত জ্যাকও একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে আছে। আমার ধারণা, গুপ্ত জ্যাক নিজেও রাতে বাসায় গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেবেছে— “আমি এইখানে আসলাম কেমনে?” অথচ একটু হাত বাড়ালেই স্কুলের সাবেক খেলার সুপারস্টারদের পাওয়া যেত। কিন্তু হাত বাড়ানো হলো না। সম্ভবত হাত বাড়ালে জিমের সেট নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার—আমাদের চন্দন বাবু নিজে খেলাধুলায় যথেষ্ট সক্রিয়। কিন্তু তিনি রহস্যজনকভাবে এই কাউন্সিলে নিজেকে রাখলেন না। কেন রাখলেন না, সেটা ইতিহাস পরিষ্কার করে বলে না। হয়তো আরও বড় কোনো পদের অপেক্ষায় ছিলেন। অথবা তাঁর বিখ্যাত সুবিধাবাদী ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আগেই সংকেত দিয়েছিল— “চন্দন, এই কমিটিতে সামনে গোজামিল আছে। দূরে থাকো।” তবে একটা সিদ্ধান্ত প্রশংসার যোগ্য ছিল। কাউন্সিলের মেম্বার করা হলো বেশিরভাগ জুনিয়রদের। কারণ তারাই তুলনামূলক ফ্রি, তারাই মাঠে থাকবে, তারাই দৌড়াবে, তারাই কাজ করবে। অর্থাৎ কাউন্সিলের গঠনটা ছিল খুবই বৈজ্ঞানিক— পদ থাকবে বড় ভাইদের, আর কাজ করবে ছোট ভাইরা। এভাবেই যাত্রা শুরু করল সেই ঐতিহাসিক “স্পোর্টস কাউন্সিল”। খেলাধুলা তখনও শুরু হয়নি। কিন্তু খেলা শুরু হয়ে গিয়েছিল। টুর্নামেন্টের বাজেট ছিল লাখ লাখ টাকা। কম করে বললেও পাঁচ লাখের উপরে, আর লোকমুখে সাত লাখের গল্পও শোনা যাচ্ছিল। তবে অনেক বছর পর স্কুলের মাঠে এমন আয়োজন—তাই প্রাক্তনরাও টাকা দিতে খুব একটা আপত্তি করেননি। আবেগের সময় মানুষ সাধারণত হিসাবের খাতা বন্ধই রাখে। অবশেষে এলো সেই সোনালি দিন! দলে দলে প্রাক্তনরা স্কুলের মাঠে ঢুকছেন। বহুদিন পর পরিচিত মাঠ, পুরোনো বন্ধু, ফুটবলের আমেজ—সব মিলিয়ে আবেগঘন পরিবেশ। কিন্তু গেট দিয়ে ঢুকতেই আবেগের সঙ্গে পরিচয় হলো আরেক জিনিসের—পোস্টার। ডানে পোস্টার, বামে পোস্টার, সামনে পোস্টার। মনে হচ্ছিল ফুটবল টুর্নামেন্ট না, স্থানীয় নির্বাচন। কাউন্সিলের তথাকথিত হর্তাকর্তাদের চেহারা এমনভাবে চারদিকে টাঙানো যে, কেউ যদি এতদিন না-ও জানত কে প্রেসিডেন্ট আর কে সেক্রেটারি, মাঠ থেকে বের হওয়ার আগেই তার মুখস্থ হয়ে যাওয়ার কথা। পোস্টারগুলোও যেন নীরবে বলছিল— “খেলা পরে দেখিস, আগে আমাদের চিনে রাখ!” পোস্টারেরও আবার একটা ধারাবাহিকতা ছিল—একেবারে বাংলা থ্রিলার সিনেমার কাস্টিংয়ের মতো! প্রথম পোস্টারে শাকিব খান, একটু সামনে গেলে রাজ্জাক, তারপর মারুফ, তারপর সালমান শাহ! অর্থাৎ মাঠে খেলা দেখতে ঢুকলেও পোস্টারের গল্প শেষ না করে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনোটায় কনভেনার, কোনোটায় সেক্রেটারি। আবার মূল ফটকে সেক্রেটারি সাহেবের বিশাল আরেকটা পোস্টার! মনে হচ্ছিল পদ একটা হলেও পোস্টারের হিসাবে দায়িত্বটা অন্তত তিন-চারটা। এরপর মাঠে ঢুকতেই আসল মাস্টারপিস— সবাই একসঙ্গে ছবিতে দাঁড়িয়ে, নিচে বিশাল করে লেখা— “WE ARE অমুকিয়ান!” লেখাটা দেখে মনে হলো বাকি হাজার হাজার প্রাক্তন ছাত্র সম্ভবত পাশের স্কুল থেকে টুর্নামেন্ট দেখতে এসেছে। স্কুলের আসল ছাত্র বলতে এরাই—এরাই কর্তা, এরাই ধরতা, বাকিরা মূলত দর্শক ও চাঁদা প্রদানকারী! আর এই অসাধারণ পোস্টার-দর্শনের পেছনের অন্যতম আইডিয়াবাজ ছিলেন আমাদের কুরুচিপূর্ণ অভিভাবকপ্রিয় চন্দন বাবু! ওয়াও! কী আইডিয়া, কী ভিশন, কী লেভেলের আইডিওলজি! ফুটবল টুর্নামেন্টকে কীভাবে নিজেদের ফটোশুটে রূপান্তর করতে হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চাইলে এই আয়োজনের পোস্টারগুলো নিয়ে গবেষণাপত্র লিখতে পারে। তখন পাঁচ-সাত লাখ টাকার বাজেটের রহস্যও কিছুটা পরিষ্কার হতে শুরু করল। শুধু পোস্টারের বহর দেখেই মনে হচ্ছিল, লাখখানেক টাকা হয়তো দেয়ালে দেয়ালেই শহীদ হয়ে গেছে! যাই হোক, টুর্নামেন্টের কোয়ালিটি ছিল, বড় ভাইদের দাপটও ছিল, আয়োজনের চাকচিক্যও ছিল। শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন ছিল— এটা কমিটি ছিল, নাকি কমেডি—সেটা বোঝাই ছিল সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট! মাঠে খেলা হবে আর ঝামেলা হবে না—এটা আশা করাটাই বোধহয় অন্যায়। শত ঝামেলার মধ্যেও কুরুচিপূর্ণ পোস্টার, বড় ভাইদের দাপট আর ট্রান্সপারেন্সির রহস্যময় অনুপস্থিতি নিয়ে টুর্নামেন্ট এগিয়ে চলল। যারা টাকা দিয়েছিলেন, তারা হয়তো খেলা দেখতে দেখতে মনে মনে একবার হলেও হিসাব করছিলেন— “কিতার মাঝে টাকা ঢালতাছি!” এতদিন অনেক কিছু দেখেও এনার্কিরা চুপ ছিল। কিন্তু এবার তাদের ধৈর্যের ব্যাটারিও শেষ। তাদের সঙ্গে যোগ দিল আরও অনেকে, যাদের কাছে ফুটবল ভালো লাগলেও এই আজব রাজনৈতিক ফুটবল মোটেও ভালো লাগছিল না। কোনো এক কফিশপে সবাই বসল গোপন বৈঠকে। আলোচনার মূল বিষয়—এই বনভোজন পার্টির কিছু একটা করা দরকার। তবে একটা বিষয়ে সবাই একমত—স্কুলের মাঠের টুর্নামেন্ট নষ্ট করা যাবে না। ঝামেলা যা করার, খেলা শেষ হওয়ার পর। কারণ ফুটবলের অপরাধ নাই, অপরাধ ফুটবলের আশপাশে ঘুরতে থাকা কিছু মানুষের। এভাবে ধাক্কাধাক্কি, পোস্টার, দাপট আর রাজনীতি সহ্য করতে করতে আল্লাহর রহমতে ফাইনালের দিনও চলে এলো। ফাইনাল শেষ। চ্যাম্পিয়ন—১৮২২-এর তরুণরা! এখানে ইতিহাসের রসবোধটা লক্ষণীয়। শামসে আরাকে নামাল তরুণরা। মাঠে দিনরাত দৌড়াল তরুণরা। কাদার মধ্যে পড়ে থাকল তরুণরা। শেষে কাপও জিতল তরুণরা! অর্থাৎ গল্পের শুরুতেও তরুণ, মাঝখানেও তরুণ, শেষেও তরুণ। এবার এলো পুরস্কার বিতরণী। সেখানেই আবার পুরোনো পৃথিবী ফিরে এলো। গ্রামের টুর্নামেন্টের আদলে একে একে আদু ভাইদের নাম ডেকে ডেকে সংবর্ধনা দেওয়া শুরু হলো। কে কী করেছেন সেটা বড় বিষয় না—মাইকে নাম উঠছে, এটাই বড় অর্জন! আগেই বলেছিলাম, এটা ছিল বিশ্বমানের আনট্যালেন্টেড তেলবাজদের এক রহস্যময় সংগঠন। ফলে তেলের সাপ্লাইয়ে কোনো ঘাটতি রাখা হলো না। কিন্তু যে তরুণরা দিনরাত এক করে কাদা মাঠে কাজ করল, টুর্নামেন্ট দাঁড় করাল—তাদের ভাগ্যে জুটল বিখ্যাত “কচু সংবর্ধনা”। মাইকে সুন্দর করে জানিয়ে দেওয়া হলো— “সময় স্বল্পতার কারণে কারও নাম নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সবাইকে ধন্যবাদ।” ব্যস! দিনরাতের পরিশ্রম কয়েক সেকেন্ডে “সবাইকে ধন্যবাদ”-এর মধ্যে দাফন হয়ে গেল। যেসব তরুণ এতদিন এনার্কিদের কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত ছিল না, তারাও এবার বুঝল—সমস্যার গন্ধটা আসলে কফিশপ পর্যন্ত ঠিকই পৌঁছেছিল। অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে স্টেজেই গেল না। আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হলো— আরেক বিপ্লব। এক পাশে তরুণদের ক্ষোভ ফুটছে। অন্য পাশে এনার্কি চুপচাপ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। তার মাথায় তখন সম্ভবত একটাই হিসাব— “সময় আইছে। এবার সব ফাইল আবার খোলা যাবে।” কারণ রাজনীতিতে যেমন, এই গল্পেও একটা নিয়ম আছে— ভুল সময়ে কথা বললে মানুষ পাত্তা দেয় না। ঠিক সময়ে একই কথা বললে সেটার নাম হয় বিপ্লব।