ফুটবল টুর্নামেন্ট তখন পুরোদমে চলছে। মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, গ্যালারিতে চিৎকার হচ্ছে, গেটে পোস্টার লাগছে, ফেসবুকে ছবি আপলোড হচ্ছে। সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থা যে, দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই—এটা ফুটবল টুর্নামেন্ট, অ্যালামনাই পুনর্মিলনী, নাকি স্থানীয় নির্বাচন। কেউ খেলছে। কেউ খেলাচ্ছে। আর কেউ এমনভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে, যেন টুর্নামেন্ট শেষে বিজয়ী দলের হাতে কাপ নয়—সংসদীয় আসন তুলে দেওয়া হবে। এই মহা আয়োজনের মধ্যেই আমাদের আইকনিক চরিত্র চন্দন বাবুর জীবনে ঘটে গেল এক আইরনিক ঘটনা। চন্দন বাবুর দলে খেলোয়াড় ছিল দশজন। তাদের মধ্যে আটজনই এনার্কির পক্ষের লোক। বাকি দুজন—গুপ্ত জ্যাক এবং স্বয়ং চন্দন বাবু। কিছুদিন পর গুপ্ত জ্যাকও এনার্কির সঙ্গে যুক্ত হলো। অর্থাৎ দশজনের দলে নয়জনই তখন এনার্কির পক্ষে। ব্যাপারটা তখন কারও কাছেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। সবাই হাসছে, খেলছে, ঠাট্টা করছে। দলের পরিবেশ হাসি-তামাশায় নাদুশ-নুদুশ। কারণ চন্দন বাবু তখন জানতেন না—ঠিক এক মাস পর এই নয়জনই তাঁর ভাঁওতাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এনার্কির পক্ষের আটজনও তখন জানত না, তারা যেসব ভাঁওতাবাজির বিরুদ্ধে এক মাস পর দাঁড়াবে, সেই ভাঁওতাবাজির প্রধান কারিগর তাদের টিমের মধ্যেই আছেন। তিনি আর কেউ নন। তাদের প্রিয় চন্দন বাঘ। ব্যাপারটা অনেকটা এমন—নয়জন লোক চোর ধরতে বের হয়েছে। চোরও তাদের সঙ্গে আছে। শুধু সঙ্গে আছে তা-ই না, চোরকে তারা যথেষ্ট সম্মান করে এবং সম্ভবত দলের দায়িত্বও দিয়েছে। আয়রনিক রাজকুমার চন্দন বাবুও বুঝতে পারেন নাই—কর্মফল নামক বস্তুটি খুব ধীরে হাঁটলেও মাঝেমধ্যে ঠিক পাশের গলিতেই দাঁড়িয়ে থাকে। চন্দন বাবুর একটা বিশেষ গুণ ছিল। তিনি মানুষকে পদ দিতে ভালোবাসতেন। বিশেষ করে কেউ যদি পদ না চায়, তাকে পদ দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ আরও বেড়ে যেত। এনার্কির বিভিন্ন সদস্যকে তিনি বিভিন্ন সময় অ্যালামনাই কমিটির নানা পদের লোভ দেখিয়েছিলেন। সমস্যা হলো, এনার্কির ছেলেদের পদপ্রার্থী হওয়ার প্রতি ন্যূনতম আগ্রহও ছিল না। তাদের মাথায় বরং অন্য প্রশ্ন— “অ্যালামনাই করতে এত পদ লাগে কেন?” প্রশ্নটা সহজ। কিন্তু সহজ প্রশ্নের উত্তর সাধারণত জটিল হয়। শামসে আরার পতনের সময় এনার্কির ভাইয়েরা খুব কাছ থেকে দেখেছিল সদ্য সাবেক হওয়া তরুণ ব্যাচগুলো অ্যালামনাই নিয়ে কী ভাবছিল। তাদের চিন্তাটা খুব কঠিন কিছু ছিল না। একটা আধুনিক ও কার্যকর অ্যালামনাই হবে। সেখানে নেটওয়ার্কিং থাকবে, মেন্টরশিপ থাকবে, ক্যারিয়ার কানেকশন থাকবে, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন থাকবে। শুধু জলসা, পোস্টার আর বিনোদন থাকবে না। কমিটিবাজি কম হবে। তেলবাজি কম হবে। ভাইবাজি কম হবে। ক্লিয়ার এজেন্ডা থাকবে। ফাইন্যান্সিয়াল ট্রান্সপারেন্সি থাকবে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার— কাজের কাজ থাকবে। রিলেভেন্ট সেক্টরে থাকা যোগ্য সিনিয়ররা তরুণদের গাইড করবেন, আর ইয়ংরা গঠনমূলক কাজে নেতৃত্ব দেবে। পরিকল্পনাটা শুনতে সুন্দর ছিল। কিন্তু সুন্দর পরিকল্পনার একটা সমস্যা আছে—সেটা বাস্তবায়ন করতে কাজ করতে হয়। পদ নিয়ে ছবি তুললে সেই ঝামেলা নেই। শামসে আরার বিদায়ের পর তাই দেখা গেল, তরুণদের মেধাবী চিন্তাগুলো ধীরে ধীরে আদুভাইদের পদের ফ্যান্টাসির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। একসময় অ্যালামনাইয়ের জায়গায় জমে উঠল যাত্রাপালা। তারপর যাত্রাপালা একটু বড় হয়ে সার্কাস হলো। আর এই বিশাল যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত ছিলেন আমাদের চন্দন বাবু। চন্দন বাবুর কর্মপদ্ধতি ছিল অনেকটা পুরোনো পঞ্চায়েত কমিটির মতো। সবাই বসবে। সবাই কথা বলবে। সবাই মতামত দেবে। শুধু ছোট্ট একটা সমস্যা— সিদ্ধান্তটা আগেই নেওয়া হয়ে গেছে। পর্দার সামনে থাকতেন সম্মানিত সিনিয়র ভাইয়েরা। তাঁদের আবেগ, স্কুলের প্রতি ভালোবাসা আর ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা সামনে রাখা হতো। আর পর্দার পেছনে? সেখানে অন্য সিনেমা। ছায়ার আড়াল থেকে মূল খেলা পরিচালনা করত চন্দন, বিক্রিয়া, গুপ্ত জ্যাক, ভাইপার ও নান্টু দাদাদের চক্র। অনেক সিনিয়র ভাই অ্যালামনাইয়ের টানে এসে প্রথমে বিষয়টা বুঝতেন না। কিছুদিন পর বুঝতেন। তারপর কেউ চুপচাপ বের হয়ে যেতেন। কেউ আরও কিছুদিন থেকে নিশ্চিত হতেন। আর কেউ বের হওয়ার রাস্তা খুঁজতে গিয়ে সামনে বিশাল “ঐক্য” লেখা পোস্টার দেখে আবার বসে পড়তেন। এর মধ্যেই ফুটবল টুর্নামেন্টে একটা ঘটনা ঘটল। ১৮০৬ ব্যাচের শহিদুল্লাহদের দল নান্টু দাদার দলকে হারিয়ে দিল। ফুটবলে এক দল আরেক দলকে হারাবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের গল্পে স্বাভাবিক ঘটনা খুব বেশি সময় স্বাভাবিক থাকে না। খেলা শেষ হওয়ার পর প্রতিপক্ষ দল বিভিন্ন নিয়মগত আপত্তি তুলল। বিষয়টি গেল টুর্নামেন্ট কমিটির সভায়। এবং সেখান থেকেই শুরু হলো নতুন নাটক। এক সকালে ছোট ফাহাদের বাসায় নাস্তা খেতে বসেছেন কমলা বাবু। টেবিলে নাস্তা আছে। চা আছে। আর আলোচনায় আছে অ্যালামনাই। কমলা বাবু টুর্নামেন্টের পোস্টার, স্থানীয় নির্বাচনের মতো স্কুলের পরিবেশ এবং নানারকম চিপ স্টান্টবাজি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। এরপর উঠল ১৮০৬ ব্যাচের সঙ্গে কমিটির ঝামেলার প্রসঙ্গ। কথা বলতে বলতে দুজন একটা বিষয়ে একমত হলেন— সুযোগ পাওয়া গেলে ইমপোস্টার শ্যাডো অথরিটির বিরুদ্ধে একটু ইন্ধন দেওয়া যেতে পারে। “একটু” শব্দটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাসে অনেক বড় আগুনের শুরুই হয় “একটু” দিয়ে। দশ মিনিট পর কমলা বাবু কফিশপে বসে আছেন ১৮০৬ ব্যাচের শহিদুল্লাহর সঙ্গে। শহিদুল্লাহ তখন যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। স্পোর্টস কমিটির অব্যবস্থাপনা এবং তাঁর দল সাসপেন্ড হওয়ার আশঙ্কা—দুটো মিলিয়ে তাঁর কফির চেয়ে মাথা বেশি গরম। কিছুক্ষণ পর কমলা বাবু ফোন দিলেন ছোট ফাহাদকে, ব্যাচ ১৮১১। শহিদুল্লাহ ফোন দিলেন বড় ফাহাদকে। দুজনই চলে এলেন। এখন টেবিলে চারজন। কফি সম্ভবত চার কাপ। কিন্তু অভিযোগের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। বড় ফাহাদ আলোচনায় ঢুকেই অত্যন্ত আগ্রাসী ভঙ্গিতে বিষয়গুলোর চূড়ান্ত সমাধান দাবি করলেন। আগের সাধারণ সভায় ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও প্রোপাগান্ডা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। তাঁর মূল ক্ষোভ ছিল— “এগুলো নিয়ে আগে প্রশ্ন করা হয়নি কেন?” এই প্রশ্নের পর আলোচনা আর ফুটবলে আটকে থাকল না। একটা দলের সমস্যা থেকে কথা গেল কমিটিতে। কমিটি থেকে গেল সাধারণ সভায়। সাধারণ সভা থেকে গেল পুরোনো অভিযোগে। তারপর অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। চারজন মানুষের কফিশপের আলোচনা বিভিন্ন ব্যাচে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। এক ব্যাচের প্রতিনিধি বলল, “আমাদের সাথেও তো এমন হয়েছে।” আরেক ব্যাচ বলল, “আমাদেরও অসম্মান করা হয়েছিল।” তৃতীয় পক্ষ বলল, “আমরা এতদিন চুপ ছিলাম।” দেখতে দেখতে একটি ফুটবল দলের অভিযোগ আর ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। সেটা হয়ে গেল তরুণদের জমে থাকা বিস্তৃত অসন্তোষ। কফিশপে বৈঠক চলতে লাগল। এক কাপ কফি শেষ হলো। আরেক কাপ এলো। মানুষ বাড়ল। গল্প বাড়ল। অভিযোগও বাড়ল। এনার্কির ছেলেরা দূর থেকে অবাক হয়ে দেখল— আদুভাই চক্র গায়ের জোর দেখাতে দেখাতে এমন দক্ষতার সঙ্গে চারপাশের মানুষকে বিরক্ত করেছে যে, তাদের আলাদা করে বিরোধী দল বানানোর প্রয়োজনই পড়েনি। বিরোধী দল নিজেরাই তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ১৭৮২ থেকে ১৭৯৮ ব্যাচের অনেক সম্মানিত সিনিয়র পরিস্থিতি বুঝে আগেভাগেই দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করলেন। তাঁদের ধারণা সম্ভবত খুব সাধারণ ছিল— অ্যালামনাই করতে এসে মান-সম্মান হারানোর কোনো মানে নেই। এর মধ্যেই এল বড় ঘটনা। সাবেরা আপার মতো অত্যন্ত সম্মানিত একজন সিনিয়র সদস্য আহ্বায়ক কমিটি থেকে পদত্যাগ করলেন। খবরটা ছোট ছিল না। কিন্তু ব্যাখ্যা? সেটা খুব একটা পাওয়া গেল না। হঠাৎ একদিন বড় ফাহাদ অ্যালামনাইয়ের অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রশ্ন করলেন— সাবেরা আপা কেন পদত্যাগ করেছেন, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা কী? প্রশ্নটা ভয়ংকর কিছু ছিল না। কাউকে গালি দেওয়া হয়নি। কাউকে চোর বলা হয়নি। বিপ্লবের ডাকও দেওয়া হয়নি। শুধু একটা ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তথাকথিত অ্যালামনাই আয়োজকদের কাছে প্রথম থেকেই কিছু প্রশ্নের জন্য একটি অলৌকিক উত্তর প্রস্তুত ছিল— “যারা অ্যালামনাই চায় না, তারাই এ ধরনের প্রশ্ন করে।” বড় ফাহাদ সম্ভবত তখনও জানতেন না, তাঁর এই সাধারণ প্রশ্নটাই একটা নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছে। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলে সমস্যা শেষ হয়। আর কিছু প্রশ্নের উত্তর না দিলে— মানুষ আরও প্রশ্ন করতে শুরু করে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঠিক সেটাই ঘটতে যাচ্ছিল। এতদিন কফিশপের টেবিলে যে অসন্তোষ ঘুরে বেড়াচ্ছিল, এবার সেটি ঢুকে পড়বে মোবাইলের স্ক্রিনে। তারপর? তারপর শুরু হবে এমন এক অধ্যায়, যেখানে মাঠ লাগবে না, মাইক লাগবে না, পোস্টারও লাগবে না। লাগবে শুধু ইন্টারনেট কানেকশন, কিছু প্রশ্ন— আর কয়েকজন অত্যন্ত বিরক্ত মানুষ! পরবর্তী পর্বে আসছে ডিজিটাল এনার্কির উত্থান!
← সব গল্পে ফিরে যানবিড়াল থেকে বাঘ হওয়ার গল্প / পর্ব 06
আয়রনিক রাজকুমার
সম্পূর্ণ সত্য ঘটনার অবলম্বনে
সম্পূর্ণ লিখিত গল্প